এস এম আমীর হামজা

গভীর রাত, চারদিকে সোন-সান নিরবতা। হঠাৎ বিকট শব্দ, তারপর আত্ম-চিৎকার। গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকা পাখিগুলো ভয়ে উড়ে গেল বহু দূরে। গভীর ঘুমে নিমজ্জিত আশপাশের মানুষ ছুটে এসে দেখলেন ভয়ঙ্কর এক দুর্ঘটনা। এখানে সেখানে পড়ে আছে রক্তাক্ত লাশ। আহত হয়ে অনেকে বাঁচার জন্য আকুতি করছেন। কারও হাত নেই-কারও পা নেই। আবার কেউ কেউ চাপা পড়ে আছেন কঠিন ধাতব বস্তুর নিচে। প্রাণহীন দেহগুলো চির নিন্দ্রায় শায়িত হলেও আহতরা নিজের সৃষ্টি কর্তাকে ডাকছেন আর বাচাঁর জন্য আকুতি করছেন।

উপরের বিবরণ পড়ে ভাবছেন এটা কোন গল্প-সিনেমা বা নাটকের কাহিনী। অনেকের হয়তোবা এমন ঘটনার কোন সিনেমার কথা মনেও পড়ে গেছে। কিন্তু না ! এটা কোন সিনেমা-গল্প বা নাটকের কাহিনি নয়। এমনই এক দূর্ঘটনা দেখেছে বাঙালী জাতি। পিতা-মাতার চোখে সামনে বাঁচার আকুতি করতে করতে সন্তানের নিস্তেজ হয়ে যাও, কিংবা সন্তানের চোখের সামনে মায়ের বাচার আকুতি। নিজের প্রিয়তম স্ত্রীকে প্রাণপন চেষ্টা করেও জমের হাত থেকে ফেরাতে পারেননি অনেক। আবার এমন অনেক হতভাগা আছেন যারা মৃত্যুর সময় নিজের প্রিয়জনদের পাশে পাননি।

বলছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষের কথা। কতো ভয়ঙ্কর ছিল সেই দূর্ঘটনাটি সেটি কেবল প্রত্যক্ষদর্শীরাই বলতে পারবেন। উপরে যে বিবরণ দিয়েছি সেটি আমার নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরাই এই বিবরণ দিয়েছেন।

সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের ক্রসিংয়ে আন্তঃনগর ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ ও ‘তূর্ণা নিশীথা’ ট্রেনের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও অন্তত শতাধিক যাত্রী। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ি জানা গেছে আহতদের মধ্যে অনেকেরই হাত-পা-কোমর ভেঙে গেছে। অর্থাৎ তারা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়েছেন।

কতো মর্মান্তিক ছিল সেদিনের ঘটনা। ৭১’র মতো তারা স্তব্ধ ভোরে যেন নেমে এসেছিল এক কালরাত। মানুষের ঘুম ভাঙে গগনবিদারী আওয়াজে। মানুষের আর্তচিৎকার ওখানে যেন কোনো নারকীয় যজ্ঞ দেখছে মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন, শিশুটির কোমল দেহটা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থাকা।

এখন প্রশ্ন হলো কেন বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। এইতো কিছুদিন আগেও মৌলভীবাজারে আরও একটি ভয়ঙ্কর দূর্ঘটনা ঘটেছিল। যদিও সেই দূর্ঘটনায় কম প্রাণহাণী ঘটেছিল, তবুও ঘটনাটি সারাদেশের মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছিল।

নিরাপদ বাহন হিসেবে যাত্রীদের পছন্দের শীর্ষে ট্রেন। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনায় সেই বাহনই এখন যাত্রীদের কাছে হয়ে উঠছে আতংক। ঘন ঘন দুর্ঘটনার ফলে রেলপথে যাত্রায় মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। কিন্তু এর কারণ কি। বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে- লক্কর-ঝক্কর রেল ও লাইনের কারণে দূর্ঘটনা ঘটছে। আবার বিশষজ্ঞদের মতে রেলে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার না করার কারণে ও চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে এসব দূর্ঘটনা ঘটছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন ‘চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে।’

তবে এটাই সঠিক- উন্নত বিশ্ব রেল দুর্ঘটনা রোধে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও বাংলাদেশের রেলে এখনও সেই প্রযুক্তি ব্যবহার সংযোজিত হয়নি। ফলে রেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি না থাকা, রেলপথে পর্যাপ্ত পাথর না থাকা, ¯িøপার, নাট-বল্টু চুরি হওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির কন্ট্রোল ব্যবস্থা না থাকা ও দক্ষ প্রশিক্ষিত চালকের অভাবেই রেল দুর্ঘটনা ঘটছে। তাহলে আমার প্রশ্ন হলো- ‘কেন তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে না?’

একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে বেসরকারি গবেষণায়, মূলত ২০১০ সাল থেকেই বাংলাদেশে রেল দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। গত ১০ বছরেই বাংলাদেশের রেলপথে প্রায় দুই হাজার ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় আড়াই শতাধিক যাত্রী। আহত হয়েছেন হাজারো।

এতদিন ছিল সড়ক পথে মৃত্যুর মিছিল। এখন রেল পথে। কবে শেষ হবে এমন মৃত্যুর মিছিল? কবে আমি, আমার সন্তান, আমার প্রিয়জন নির্ভয়ে চলতে পারবো। আমারও-তো পরিবার আছে। আমি পরিবারের একমাত্র উপার্যনকারি ব্যক্তি। আমি মারা গেলে কি হবে আমার পরিবারের। একটি প্রাণের সাথে আরও কতটি প্রাণের মৃত্যু হয় জানা আছে কি কারও ? আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হবে। কত হতে পারে আমার জীবনের মূল্য ?

আমি সব হিসেবে করব না। শুধুমাত্র ২০১৯ সালের প্রথম থেকে এই পর্যন্ত কতটি তাজাপ্রাণের প্রদীপ নিভেছে সড়কে ? তার কারণ কি কারও সঠিক জানা আছে। আর সরকার কতটা কারণ জেনেছে ? কতটা মৃত্যুর বিচার হয়েছে বা আগামীতে হবে ? জানি আমি অযথা এমন প্রশ্ন করছি। একটি প্রশ্নের উত্তর যেখানে খোঁজে পাওয়া যায় না সেখানে, এতগুলো প্রশ্ন করা বোকার কাজ ছাড়া কিছুই না।

আমি চাই না প্রশ্ন করতে। আমি চাই না কোন কৈপিয়ত। আমি শুধু চাই আমার নিরাপত্তা, আমার মা-বাবার নিরাপত্তা, আমার ভাই-বোনের নিরাপত্তা, আমার সন্তানের নিরাপত্ত, আমার দেশবাসীর নিরাপত্তা। আমি স্বপ্ন দেখি নিরাপদ সড়কের, আমি আন্দোলন করি নিরাপদ সড়কের জন্য। কিন্তু ফল কি ? মৃত্যুর পর এক লাখ/দুই লাখ/ পাঁচ লাখ টাকা অনুদান। তদন্ত কমিটির নামে প্রতারণা। এসব আর কত ? আমিতো কঠিন কিছু চাইনি ? আমি টাকা চাই না, খাবার চাই না ! আমি ভয় থেকে মুক্তি চাই, আমি নিরাপত্তা চাই।