দিনরাত প্রতিবেদক : ওসমানীনগরের গোয়ালা বাজার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। ব্যাংক স্ট্যটমেন্ট ও বিদ্যালয় তহবিলের টাকার হিসাবে ফারাক রয়েছে। শিক্ষকদের মাসিক বেতনের সাথে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রদান করা বেতনের রশিদ দেয়া হয়নি।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক ও বর্তমান একাধিক সদস্য এসব বিষয়ে প্রধান শিক্ষককে বারবার অবহিত করলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। বিগত দিনে ঐতিহ্যবাহী ওই বিদ্যালয়ের সুনাম রক্ষার স্বার্থে বিদ্যালয় পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ নিরব ছিলেন। সর্বশেষ ওই প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার আগের দিন কোনো সভা আহবান না করে গ্রেজুইটির খাত দেখিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন তহবিল থেকে দেড় লক্ষ টাকা তুলে নেয়ায় স্বোচ্ছার হন সংশ্লিষ্টরা।

এবিষয়ে অভিভাবক ও এলাকাবাসী পক্ষ থেকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য স্বাক্ষরিত ১১ নভেম্বর সিলেটের সহকারী জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে প্রেরণ করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে- বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল লেইছের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ায় চলতি বছরের ৩০সেপ্টম্বর তিনি চাকুরি থেকে অবসর নেন। তিনি দায়িত্বকালে আর্থিক দুর্নীতি ও নানা অনিয়মে বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষার্থীদের ফলাফলের কোনো প্রগ্রেস রিপোর্ট নেই। শিক্ষার্থীদের বেতন আদায়ের ক্যাশ রেজিস্ট্রার মেইনটেইন করা হয়নি। সদ্য সাবেক প্রধান শিক্ষক আবুল লেইছ সরকারি বরাদ্দের ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর তার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে এগুলো চুরি হওয়ার বিষয়টি বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের জানালেও তিনি সুষ্ঠ ব্যাখ্যা দেননি। শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রশ্নপত্র না এনে বাজারি প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নিতেন তিনি। শ্রেণি কক্ষ ও আসবাবপত্রের সংকটসহ নানা সমস্যা থাকলেও ওই শিক্ষক অর্থ আত্মসাতে মগ্ন থাকায় সেদিকে খেয়াল করেননি।

তিনির দায়িত্ব হস্তান্তরের আগের দিন গ্রেজুইটির খাত দেখিয়ে নিয়ম বহিভূর্তভাবে বিদ্যালয় ফান্ডের প্রায় দেড় লক্ষ টাকা তুলে নেন। মিড ডে মিল অনুষ্ঠান দেখিয়ে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর নিয়ে রেজুলেশন করে কৌশলে টাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি এই টাকা উত্তোলন করেন। মনগড়া রেজুলেশন তৈরী করে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর নিয়ে টাকা উত্তোলন ও আত্মসাতের বিষয়টি প্রতারণার শামিল। এই বিষয়ে পরিচালনা কমিটির সদস্য ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রধান শিক্ষক আবুল লেইছের দায়িত্বকালে সৃষ্ঠ অনিয়ম এবং আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিলেট জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আব্দুল কুদ্দুছ শেখ ও আব্দুল মুমিন বলেন, ওই প্রধান শিক্ষক দায়িত্বে থাকাকালে বিদ্যালয়টি নানা অনিয়মে ভরপুর ছিল। বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও মান রক্ষার স্বার্থে আমরা পরিচালনা কমিটির সভায় প্রতিবাদ করলেও কখনো তা বাহিরে প্রকাশ করিনি। কিন্তু অবসরে যাওয়ার আগের দিন বিদ্যালয় ফান্ড থেকে দেড় লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ায় আমরা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য প্রবীণ সাংবাদিক আলাউর রহমান রহমান আলা ও বর্তমান কমিটির শিক্ষানুরাগী সদস্য শাহনূর রহমান শানুর বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের এমন আচরণে আমরা মর্মাহত হয়েছি। টাকা উত্তোলনের বিষয়টি আমরা জানতে পেরে ওই টাকা বিদ্যালয় ফান্ডে ফেরৎ দেয়ার জন্য তাকে প্রস্তাব করি। আমাদের প্রস্তাবে তিনি ৫০ হাজার টাকা ফেরৎ দিতে রাজি হন। কিন্তু কথা মত টাকা ফেরৎ না দিয়ে উল্টো নানা অজুহাত দেখান। তাই প্রতিষ্টানের স্বার্থে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক।’

গোয়ালাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুন মিয়া বলেন, ‘অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক ৫০ হাজার টাকা ফেরৎ দেয়ার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তিনি টাকা ফেরৎ দেননি।’

গোয়ালা বাজার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক অবুল লেইছ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি যৌথ একাউন্ট তাই সভাপতির স্বাক্ষর নিয়েই আমি টাকা উত্তোলন করেছি। এই টাকা গ্রেজুইটি বাবত আমাকে দেয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বির্তক ওঠলে আমি ৫০ হাজার টাকা ফেরৎ দেয়ার কথা বলেছি।’

কিন্তু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ ব্যপারে ওসমানীনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার চক্রবর্তী লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাছা. তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘আমি এবিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’