২০১৯ সালে চা চাষের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন করে বাংলাদেশ। উৎপাদিত হয় ৯৬ দশমিক ০৭ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি। এরপরের বছরেই (২০২০ সালে) চা উৎপাদন কমেছে ৯৬ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। ২০২০ সালে চা উৎপাদন করা হয়েছে ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার কেজি।

তবে উৎপাদন কম হলেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ সালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার কেজি।

চা বোর্ড জানায়, গত বছর দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল সাত কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার কেজি। প্রথম পাঁচ মাসে (মে পর্যন্ত) চা উৎপাদন ব্যাহত হয় আবহাওয়ার কারণে। করোনার জন্য চা উৎপাদনে শংকা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সব বাগান চালু রাখতে পারায় চা উৎপাদন অব্যাহত ছিল। তাই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশী চা উৎপাদন হয়; মোট উৎপাদন হয় ৮ কোটি ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার কেজি।

গত (২০২০) বছরে উৎপাদিত চায়ের মধ্যে জানুয়ারী মাসে ১ লাখ ৭৫ হাজার কেজি, ফেব্রুয়ারীতে ২৬ হাজার কেজি, মার্চে ১৬ লাখ ২৫ হাজার কেজি, এপ্রিলে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার কেজি, মে তে ৮৬ লাখ ৫৫ হাজার কেজি, জুনে ৮৯ লাখ ৬৩ হাজার কেজি, জুলাইয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার কেজি, আগস্টে ১ কোটি ১৩ লাখ ২১ হাজার কেজি, সেপ্টেম্বরে ১ কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার, অক্টোবরে ১ কোটি ১৪ লাখ ৬৮ হাজার , নভেম্বরে ১ কোটি ৪ লাখ ৯৫ হাজার ও ডিসেম্বরে ৬৯ লাখ ৬১ হাজার কেজি চা উৎপন্ন হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন প্রথম পাঁচ মাসে চা উৎপাদন কম ছিল তাই কমেছে চায়ের উৎপাদন । কারণ হিসেবে তারা বলেছেন আবহাওয়ার কথা। আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যহত হয়।

কুলাউড়ার গাজীপুর চা বাগান বাগানের উর্ধতন ব্যবস্থাপক শেখ কাজল মাহমুদ জানান, ‘২০১৯ সাল থেকে ২০২০ এ উৎপাদন কমেছে ১২ শতাংশ। তার বাগানে ২০১৯ চা উৎপাদন করা হয় ১১ লাখ ৯৬ হাজার কেজি এবং ২০২০ সালে ১২ লাখ কেজি টার্গেট থাকলেও উৎপাদন করা হয় ১০ লাখ ৪৭ হাজার। ২০২০ এ টার্গেট পূরণ না করতে পারায় ২০২১ সালে আবারও ১২ লাখ কেজি ধরা হয়েছে।’

তবে আবহাওয়া খারাপ হলেও বছরের মধ্যভাগ থেকে আবহাওয়া চা-বান্ধব হতে শুরু করলে কোন কোন বাগান রেকর্ড উৎপাদন বছর ২০১৯ থেকে ২০২০ সালে আরো বেশী উৎপাদন করেছে। তাদেরই একটি নাহার চা বাগান।

নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক পীযুষ কান্তি জানান, বালিশিরা ভ্যালিতে মোট ৩২ টি বাগান আছে তার মধ্যে আমাদের বাগানসহ ৩টি বাগান চা উৎপাদনের রেকর্ড বছর হিসেবে খ্যাত ২০১৯ সাল থেকেও বেশী উৎপাদন করেছে। ২০১৯ সালে আমাদের বাগানে উৎপাদিত হয়েছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৭ কেজি চা কিন্তু ২০২০ সালে প্রায় ৫ হাজার কেজি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ এ উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার কেজি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অক্টোবরে দিকে যে বৃষ্টি হয়েছে তা চায়ের উপকার করেছে।

২০২০ সালে চায়ের দাম এর আগের বছরের চেয়ে ভাল ছিল।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের বিপনন কর্মকর্তা আহসান হাবিব জানান, ২০২০-২১ নিলাম বর্ষে (এপ্রিল ২০২০ থেকে জানুয়ারী ২০২১ পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ৩৪ টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ১৮৮.০৮ টাকা কেজি ধরে ৭ কোটি ২ লাখ ৯০ হাজার কেজি বিক্রি হয়েছে এবং শ্রীমঙ্গলে ১৫টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে ১৭১.৭৮ টাকা কেজি দরে ৭ লাখ ৯৫ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে।

২০১৯-২০ (এপ্রিল ২০১৯ থেকে মার্চ ২০২০) নিলাম বর্ষে চট্টগ্রাম এবং শ্রীমঙ্গলে মোট ৪৪টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়; এতে ১৭৬.০৮ টাকা দরে ৯ কোটি ৪৩ লক্ষ কেজি চা বিক্রি হয়।

টি প্লান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিপিটিএবি) সদস্য সচিব জহর তরফদার বলেন, ‘২০২০ এ শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে করোনার শুরুতে গ্রাহকের উপস্থিতি খুব কম ছিল তাই নিলাম অনুষ্ঠান নিয়ে আমরা সমস্যায় ছিলাম এবং চা বিক্রিও কমেছিল, কিন্তু লকডাউন তুলে নেওয়ার পর আস্তে আস্তে গ্রাহকের হার বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে নিলামে আগের থেকে অনেক বেশি চা বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা বেড়েছে বলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যাপকভাবে চা বিক্রি হচ্ছে।’

বাংলাদেশ চা বোর্ডের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমেদ জানান, ‘আমদানিনির্ভর চা খাত গত তিন বছর ধরে রপ্তানিমুখী হয়েছে। করোনাভাইরাসের মধ্যে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সব বাগানে কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছিল তাই করোনার সময়েও আমরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী চা উৎপাদন করেছি। চলতি বছরে আরও বেশী উৎপাদন হবে।’

বছরের শুরুর দিকে আবহাওয়া খারাপ থাকলেও পরে অনুকূলেই থাকায় বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চা উৎপাদন বেশী হয়েছে।

বাংলাদেশ চা সংসদ সিলেট শাখার চেয়ারম্যান জিএম শিবলি বলেন, ‘২০২০ এ চা কম উৎপাদন হওয়ার কারণ আবহাওয়া ভাল ছিলনা তার উপর প্রথম দিকে করোনার কারণে আমরা চিন্তিত ছিলাম। তবে চলতি বছরের গত বছর থেকে বেশী চা উৎপাদন হবে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি’।

উল্লেখ্য, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। দেশ স্বাধীনের সময় দেশে চা বাগানের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। বর্তমানে সারাদেশে বিদেশি কোম্পানি, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোটবড় মিলিয়ে চা বাগানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৬টি। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি। বাকিগুলো হবিগঞ্জে ২৪টি, সিলেটে ১৯টি, চট্টগ্রামে ২২টি, পঞ্চগড়ে সাতটি, রাঙ্গামাটিতে দুটি ও ঠাকুরগাঁওয়ে একটি।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা বছরে ৯ কোটি কেজি। ২০১০ সাল থেকে এই চাহিদা পূরণ করতে চা আমদানি শুরু হয়। ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ এক কোটি ১৪ লাখ কেজি চা আমদানি হয়। ২০১৬ সালে আট কোটি ৫০ লাখ কেজি পরিমাণ চা উৎপাদন করে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে চা-শিল্পের ১৬৫ বছরের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের রেকর্ড তৈরি হয়। সে বছর চা উৎপাদিত হয় ৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি।