দিনরাত ডেস্ক : মাদক ও ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান চালাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে আটকরা ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের মধ্যম সারির নেতা। চলমান অভিযানে দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু নেতা ক্ষুব্ধ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তা প্রশংসিত হয়েছে। জনগণের সামনে এসেছে কিছু মানুষের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। মাদক ও ক্যাসিনো ব্যবসা এবং টেন্ডারবাজির অন্ধকার জগতের শিউরে ওঠা তথ্যে চমকে উঠেছেন অনেকেই।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পরিধি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এর ফলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ পথে অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যাওয়া দল ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কমপক্ষে ১০০ দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির নামের তালিকা এখন প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে। বিশেষ করে গত ১১ বছরে হঠাৎ করেই যারা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’-এ পরিণত হয়েছেন তাদের মনে ভয়- কখন কী হয়! প্রশাসনের নজর এড়াতে এদের অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন, কেউ বা নীরবে বিদেশ চলে গেছেন আবার কেউ বিদেশে পাড়ি জমাতে গোপন চেষ্টায় লিপ্ত।

আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, র‌্যাব-পুলিশের চলমান অভিযানে দলীয় নেতা-কর্মীরা ধরা পড়লেও এতে দলের ‘ইমেজ’ ভালো হচ্ছে। আর এই সাফল্যের কৃতিত্বের দাবিদার দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স‘ নীতি প্রশাসনকে অভিযান পরিচালনায় সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছে বলে অভিমত তাদের।

সম্প্রতি চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তখনও আঁচ পাওয়া যায়নি সামনে কী হতে যাচ্ছে! একদিন পরেই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ধরা পড়েন। এরপরই ঢাকার ‘স্বনামখ্যাত’ ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার খবর সামনে আসে। ক্যাসিনোগুলোতে মদ, জুয়াসহ অসামাজিক কর্যকলাপ সবই চলত বলে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন খবর সামনে আসে। ক্যাসিনোর খবর ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়। এরপর একে একে ধরা পড়েন টেন্ডার মাফিয়া জি কে শামীম, কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের বার ও ক্যাসিনোতে যেমন অভিযান চলতে থাকে, তেমনি আটককৃতদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যও যাচাই-বাছাই করতে থাকেন গোয়েন্দাবাহিনীর সদস্যরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার ক্যাসিনোগুলোর টাকার ভাগ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এমনকি আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা পেতেন। বিশেষ করে ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডারাস ক্লাব, ধানমন্ডি ক্লাবের ক্যাসিনোতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ১০ জন নেতা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এদের মধ্যে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক পর্যায়ের নেতাও রয়েছেন। এছাড়া যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কয়েকজন সংসদ সদস্য, প্রশাসনের বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ক্যাসিনোগুলো থেকে উপার্জিত অবৈধ অর্থের ভাগ নিতেন। তাদের পক্ষে মহানগর যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ নেতা, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও কাজ করতেন। পুরো চক্রটি ঢাকার অপরাধ জগত তথা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত দলীয় নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে সমস্ত তথ্যই প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে কয়েকমাস আগে। যা দেখে দারুণ ক্ষুব্ধ হন সরকারপ্রধান। সরকারের উপর মহলের সবুজ সংকেত পেয়েই অভিযানে নামে প্রশাসন। আটক খালেদ, শামীম ও ফিরোজের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছে পুলিশ। তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেলে সেগুলো জাতীয় নিরাপত্তা সেলের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি চলমান অভিযানের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তার একজন উপদেষ্টা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি জাতিসংঘে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশমতো সরকারের নির্দেশনা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে দলে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার দাবি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল থেকে উঠছিল। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব সোর্স ও বাহিনী দিয়ে আওয়ামী লীগসহ যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগের সকল বিতর্কিত, অপকর্মকারী, দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরি করেন। এখন তাদের শাস্তি দিয়ে দলকে যেমন শুদ্ধ করা হবে তেমনি দলের ইমেজও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এমনকি এই অভিযানের প্রভাব আওয়ামী লীগের সম্মেলনের ওপরেও পড়বে। অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজদের দল থেকে বের করে দেওয়া হতে পারে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ বলেন, আমাদের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় সর্বসম্মতভাবেই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলীয় সভাপতি এদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। এ অভিযান আরও বিস্তৃত হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ক্যাসিনোর সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। তবে সংখ্যাটা কত সেটা আমি জানি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে এ শুদ্ধি অভিযান সারা দেশেই ছড়িয়ে যাবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শুধু যুবলীগ বা ছাত্রলীগের প্রশ্ন নয়, আওয়ামী লীগেরও যারা অনিয়ম, দুর্নীতি করবে- তাদেরও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। যাদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যায়-অনিয়ম বা দুর্নীতিতে প্রশাসন বা রাজনীতির কেউ যদি মদদ দিয়ে থাকেন তাহলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো গডফাদারই ছাড় পাবে না।