বাংলাদেশ থেকে গিয়ে ছয় মাস মহাকাশে কাটিয়ে ফিরল ধনে পাতার বীজ। সেখানে কিছু বীজ থেকে গজিয়েছে চারাও।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং জাপানি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার উদ্যোগে গত ৭ মার্চ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে যায় ধনে পাতার ৩০ গ্রাম বীজ। সেখানে রোপনও করা হয় কিছু। বাকি চারাগুলো ফেরত পাঠানো হয় গত ৭ সেপ্টেম্বর।

এসব তথ্য সংবাদ সম্মেলন করে বুধবার জানিয়েছে ঢাকার আশুলিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বায়োটেকনোলজি (এনআইবি)।

সংস্থার মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ জানান, মহাকাশে খাদ্য উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছে নাসা ও জাক্সা। এই প্রকল্পের নাম ‘এশিয়ান হার্বস ইন স্পেস’। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা নানা প্রজাতির গাছের বীজ পাঠানো হয়।

সলিমুল্লাহ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনালোজির (এমআইটি) এর স্পেস সিস্টেম ল্যাবরেটরির প্রকৌশলী মিজানুল হক চৌধুরী জাক্সার এই প্রকল্পের বিষয়ে জানতে পেরে এতে বাংলাদেশি উদ্ভিদের বীজ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করেন। তার সমন্বয়েই এনআইবি গত ডিসেম্বরে জাপানে পাঠায় ধনে পাতার তিন প্যাকেট বীজ।

এনআইবির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুসলিমা খাতুন বলেন, আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে জাপানের কিবো মডিউলে ১২টি দেশের বীজ থেকে চারা গজানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন জাক্সার নভোচারী সইচি নোগুচি। তিনি বিভিন্ন সময় বীজগুলোর অবস্থা সম্পর্কে বার্তা পাঠান জাক্সায়।

মুসলিমা জানান, সেসব বার্তা থেকে জানা গেছে, ধনে বীজ থেকে চারা গজিয়েছে মহাকাশে। তবে ঠিক কতো সময় তাতে লেগেছে সেটি জানার জন্য ধনে বীজ বাংলাদেশে ফেরত আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওই বীজের সঙ্গে মহাকাশে থাকাকালীন বিস্তারিত তথ্যও পাঠাবে জাক্সা। ধারণা করা হচ্ছে, দুই মাসের মতো সময় লেগেছে বীজ থেকে চারা গজাতে।

মুসলিমা আরও জানান, বাড়তি বীজগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নাসায় আছে। জাপানের জাক্সা হয়ে দেশে এসে পৌঁছালে সেগুলোর ওপর আবার পরীক্ষানিরীক্ষা চালাবে এনআইবি।

এমআইটির প্রকৌশলী মিজানুল হক এনআইবিতে পাঠানো ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘জাক্সার এই গবেষণায় বাংলাদেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কিছু দেশ অংশ নিয়েছে। এসব দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদের বীজ পাঠানো হয়েছে।

ধনে বীজই কেন বেছে নেয়া হলো স্পেস স্টেশনের জন্য- এমন প্রশ্নে মিজানুল বলেন, ‘মহাকাশযান এবং মহাকাশ স্টেশনে জায়গা অনেক সীমিত। সেখানে এমন ধরনের খাদ্য উৎপাদন করা প্রয়োজন যা অনেক কঠিন পরিবেশে স্বল্প পানি, বায়ু ও জায়গায় বেড়ে ওঠে এবং যাতে অনেক মিনারেল থাকে। অ্যাস্ট্রোনটদের (নভোচারী) জন্য মিনারেল অনেক প্রয়োজন।

‘এরকম পরিবেশে আমরা দেখলাম, বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের মধ্যে ভেষজটাই খুব উপযোগী। জ্যাক্সা এবং নাসা ধনিয়া বীজকে বাছাই করেছে একটাই কারণে যে, এটা খুব অল্প জায়গায় বেড়ে ওঠে। অনেক ঘনভাবে এটাকে উৎপাদন করা সম্ভব। এটার উপকারিতা অনেক বেশি; ঘ্রাণও অনেক ভালো। অ্যাস্ট্রোনটদের কাছে অনেক ভালো লাগবে বলে মনে করি।’

আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে এই ধনে বীজসহ যেসব উদ্ভিদের বীজ গেছে, সেগুলো নিয়ে কী ধরনের গবেষণা হবে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন মিজানুল।

তিনি বলেন, ‘এই গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পৃথিবী থেকে যখন এই ধনিয়া বীজকে নভোযানের মাধ্যমে স্পেস স্টেশনে পাঠানো হয়, তখন বীজের উপর কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে তা দেখা। তারপর সেখানে গিয়ে তিন, চার, ছয় মাস বা এক বছর থাকবে। সেই সময় তার কী পরিবর্তন আসছে, তাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

‘মহাকাশে জিরো গ্র্যাভিটি (শূণ্য অভিকর্ষ বল) থাকে। মহাকাশযান খুবই স্পিডে পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণ করে। এসব কারণে এই বীজের উপর কোন ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, দেখা হবে। সবশেষে সেখানে থাকার পর সেই বীজগুলোকে যখন পৃথিবীতে পাঠানো হবে, সেগুলো পৃথিবীতে রোপণ করা হলে যে গাছ হবে, তাতে কোনো পরিবর্তন হয় কি না সেটিও দেখা হবে। আপাতত আমরা এই বিষয়গুলো নিয়েই গবেষণা করব।’

বাংলাদেশে বাড়তি বীজগুলো ফেরত এলে ড. সলিমুল্লাহর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করবেন এনআইবির মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কেশব চন্দ্র দাস, মুসলিমা খাতুন ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা।

ড. সলিমুল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের ধনে বীজ দেশের প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে এখন ইতিহাসের অংশ। আমাদের ধনে বীজ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে জাপানের কিবো মডিউলে ছয় মাস থেকে ফিরে এসেছে পৃথিবীতে। হাইড্রোপনিক সিস্টেম ও আর্টিফিশিয়াল সানলাইট ব্যবহার করেই সেখানে ধনিয়া বীজ রাখা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘মহাকাশে পাঠানোর আগে বীজগুলোর নমুনা সংরক্ষণ করা হয় এনআইবির গবেষণাগারে। মহাকাশ ঘুরে আসা বীজগুলো এনে দুই প্রকারের তুলনামূলক অবস্থা পরীক্ষা করা হবে। এরপর বোঝা যাবে, মহাকাশ ঘুরে আসা বীজে কোনো ধরনের ফিজিওলজিক্যাল এবং মলিকুলার পরিবর্তন হয়েছে কি না। এসব তথ্য পৃথিবীর বাইরে প্রাণের বংশবিস্তার এবং ভবিষ্যতে মহাকাশে ফসল ফলানোর সম্ভবনার পাশাপাশি না জানা অনেক প্রশ্নের উত্তর এনে দিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের অনুমোদন, দিকনির্দেশনা এবং উৎসাহ সম্ভব করেছে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মহাকাশ জীববিজ্ঞান গবেষণায় যুক্ত করতে। মহাকাশ জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত এই গবেষণায় দেশের নবীন শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করা হবে।’