হবিগঞ্জের বাহুবলে সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতাধিন অকটেন উৎপাদনকারী কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের বিকট শব্দ ও কৃত্রিম ভূ-কম্পনে আতঙ্কিত আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। কৃত্রিম ভু-কম্পনের কারণে গ্রামগুলোর বাড়ি-ঘরে দেখা দিয়েছে ফাটল। রাতে শব্দ ও ভূ-কম্পনের মাত্রা বেড়ে গেলে আতঙ্কও বৃদ্ধি পায় গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে।

স্থানীয়দের দাবি, দিনরাত বিকট শব্দ এবং ভূ-কম্পনের কারণে শিশুদের মধ্যে নানা মানষিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ ব্যাপারে বিষয়টির প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বাহুবল উপজেলার রশীদপুরের বড়গাঁও এলাকায় আকটেন উৎপাদনকারী কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের ‘ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট’ চালু করা হয় গেল বছরের শেষের দিকে। চালুর করার পর থেকে শব্দ স্বভাবিক মাত্রায় ছিল। কিন্তু গত ৮ এপ্রিল সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে ‘ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট’-এ শব্দের মাত্রা প্রখট আকার ধারণ করে। পাশাপাশি ইউনিটের আশপাশে কৃত্রিম ভূ-কম্পনের সৃষ্টি হয়। ২৪ ঘন্টা সেখানে ‘ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিট’ চালু থাকার কারণে শব্দ ও ভূ-কম্পনও ২৪ ঘন্টাই স্থায়ী থাকে। রাতের নিরব প্রকৃতি ও ‘ক্যাটালাইটিক রিফরমিং ইউনিটে’ উচ্চমাত্রায় প্রেসার দেয়ার কারণে শব্দ ও ভূ-কম্পনের মাত্রাও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।

অব্যাহত ভূ-কম্পনের কারণে কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের আশপাশের গ্রামগুলোর অন্তত ১৫ হাজার মানুষের মধ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফাটল দেখা দিয়েছে গ্রামগুলোর কাচাঁ-পাকা বাড়ি-ঘরে। বিকট শব্দ ও ভূকম্পনের প্রভাব আশপাশের অন্তত ১২টি গ্রামের মধ্যে অনুভুত হলেও সবচেয়ে বেশি নাজেহার হচ্ছেন বড়গাঁও, শাহানগর, রশীদপুর, অলিপুর, চক্রামপুর, শফিয়াবাদ ও সাহাপুরের মানুষ।

এ ব্যাপারে শাহানগর গ্রামের টিপু দেব বলেন, ‘প্রথম অবস্থায় কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে শব্দের মাত্রা কিছুটা স্বাভাবি ছিল। কিন্তু গত ৮ এপ্রিল সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যেদিন আগুন লাগে সেদিন এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে। যদিও সেদিনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের কোন ক্ষতি হয়।’

তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কনডেনসেটের মেশিনে প্রচন্ড শব্দ শুরু হয়। সেই সাথে কৃত্রিম ভূ-কম্পনের সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে আমরা কয়েকটি গ্রামের বাসীন্দা কনডেনসেটের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললেও কোন সমাধান হয়নি।’

শফিয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা মো. তৈয়ব আলী বলেন, ‘দিনের বেলা শব্দ আর ভূমিকম্প কিছুডা কম থাকলেও রাতে বেশি হয়। মাঝে মাঝে মাঠি এমনভাবে কাঁপে, সারারাইত ঘুমানো যায় না। বাচ্চা-খাইচ্ছা নিয়া জাইগা থাকা লাগে। পুলা-পুরি (ছেলে-মেয়ে) লোখাপড়া করতে পারে না। এই অবস্থার মাঝে আমরা আছি।’

বড়গাঁও গ্রামের গৃহবধূ স্বপ্না দেব বলেন, ‘রাতে যখন বাচ্চা-খাচ্ছা নিয়ে ঘুমে থাকি। হডাৎ কইরা বাচ্চায় ছিল্লি (চিৎকার) দিয়া ঘুম থাইক্কা উইট্টা (উঠে) আনজা দিয়া (জড়িয়ে) ধরে। শব্দ আর মাটির কাঁপনে বাচ্চা পুলাপানের (শিশুদের) বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতাছে। আমরা অসহায় মানুষ কিতা করমু কুছতা (কিছু) বুঝতাছি না। সরকার যেন আমরারে এই অবস্থা থাইক্কা মুক্তি দেয় ইডাই চাই।’

একই গ্রামের আবির দেব নামে এক কলেজছাত্র বলেন, ‘কনডেনসেটের শব্দে ও কৃত্রিম ভূমিকম্পনের কারণে বাড়ি-ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। কখন ঘর ভেঙে পড়ে, কে ঘরের নিচে চাপা পড়ে, এই আতঙ্কে আমাদের দিন কাটছে। ঘর থেকে ডাক দিলে বাহিরের লোকে শুনে না, বাহির থেকে ডাক দিলে ঘরের লোকে শুনে না। এখানে আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।’

স্থানীয় ভাদেশ্বর উইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান এখলাছুর রহমান বলেন, ‘আমরা গ্রামের ময়মুরব্বিদের নিয়ে পেট্রল উৎপাদনকারী কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের এই শব্দ ও ভূ-কম্পনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে কতা বলেছি। তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছিলেন এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন হয়ে গেল এখনও তারা কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু পূর্বে এই শব্দ বা কম্পন ছিল না। প্লান্টে আগুন লাগার পর থেকেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেহেতু মনে হচ্ছে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি হতে পারে। সুতরাং কর্তৃপক্ষ চাইলেই এর সমাধান করতে পারবে।’

এদিকে, বিষয়টি সমাধানের জন্য গত ২৭মে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা পরিষদের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান, বাহুবল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্নীগ্ধা তালুকদার ক্ষতিগ্রস্থগ্রামগুলো পরিদর্শন করেছে। এ সময় তারা বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেবেন বলে বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করেন।

জানতে চাইলে বাহুবল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলেন, ‘গ্রামবাসীর অভিযোগ পাওয়ার পর আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি ভয়াবহ চিত্র। কৃত্রিম ভূমিকম্পের কারণে গ্রামের বাড়ি-ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য আমি কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলি। তারা দ্রুত বিষয়টি সমাধানের জন্য আমাদের আশ্বস্ত করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি যেন তাদেরকে কোন নোটিশ না দিতে এক কর্মকর্তা ফোন করেন। আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি আমাকে কিছুটা হুমকি দিয়েছেন। তবে আমি আর কয়েকদিন অপেক্ষা করব। এর মধ্যে বিষয়টি সমাধান না হলে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদেরকে নোটিশ দেয়া হবে।’

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছি। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট গ্যাসফিল্ডের আওতাধিন আকটেন উৎপাদনকারী কনডেনসেট ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের কোন কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।