অধীর দাস : ‘ভোলাভুলি সংক্রান্তি’ বাঙালীর ঐহিত্য ও কৃষ্টির একটি অংশ। এক সময় কার্তিক মাসের শেষদিন গ্রাম বাংলার প্রায় ঘরে ঘরেই এ উৎসব হতো। এখনও অনেক গ্রামে এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এর বিস্তৃতি কমে এসেছে কয়েক গুণ। গ্রাম বাংলার বিশাল জনগোষ্টির একটি অংশ এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।

রোববার কার্তিক মাসের শেষ দিন হওয়ায় হবিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে জেলার বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এ অনুষ্ঠান বেশি অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে।

বাঁশ ও খড় দিয়ে মানুষের মত একটি ‘ভোলা’ তৈরি করা হয়। সন্ধ্যায় ছেলে-মেয়েরা একত্রিত হয়ে এই ভোলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। নিমেষেই পোড়ে ছাই হয়ে যায় ভোলা। এ সময় বলা হতো-

‘ভোলা পুড়, ভুলি পুড়
মশা মাছি বাইর-হ
টাকা পয়সা ঘর-ল
সংসারের জঞ্জাল দূর-হ’

‘ভোলাভুলি’র অন্যতম আকর্ষণ ছিল- এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে গিয়ে কলা গাছের ডাল দিয়ে মানুষের ‘ভোলা’ ছাড়ানো। এই ভোলা ছাড়ানোর সময় বলা হতো-

‘ভোলা ছাড়, ভুলি ছাড়
বার মাইয়া পিছা ছাড়।
ভাত খাইয়া লড়চড়
পানি খাইয়া পেঠ ভর।
খাইয়া না খাইয়া ফোল
হাজার টাকার মূল’

হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান মনে করা হলেও এটি হিন্দু-মুসলিম সবাই সমানভাবে পালন করে থাকেন। যদিও ‘ভোলাভুলি’ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে সামব্যাপী চলে আয়োজন। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকেরা কার্তিক মাসকে নিয়ম মাস হিসেবে পালন করতো। এ সময় প্রতিদিন সকালে স্নান করে দেবতাকে ভোগ দেয়া হতো। আর মাসব্যাপী এই সংযমের শেষদিন ভোলা সংক্রান্তি হিসেবে এই ‘ভোলাভুলি’ পালন করা হয়।

কিন্তু ‘ভোলাভুলি’ এখন বিলুপ্তের পথে। তবে এখনো গ্রমের কিছু কিছু এলাকায় এই ‘ভোলাভুলি’ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। আবার কিছু কিছু অঞ্চলে বর্তমান প্রজন্ম এই ‘ভোলাভুলি’ সম্পর্কে জানেই না।

এ ব্যাপারে বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বৃদ্ধ সুরেশ সরকার বলেন- ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এই ‘ভোলাভুলি’র জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। কখন ‘ভোলাভুলি’ আসবে। ‘ভোলাভুলি’তে সারাদিন ও মাঝরাত পর্যন্ত আমরা অনেক মজা করতাম। কিন্তু এখন আর আগের মতো ‘ভোলাভুলি’ হয় না।

একই উপজেলার আড়িয়ামুকুর গ্রামের অভিনাশ দাস বলেন- ‘ভোলাভুলি’তে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে অনেক আনন্দ উৎসব হতো। অনেকে মাইক দিয়ে গান বাজনা করত। কিন্তু এখন শুধু সন্ধ্যার সময় ভোলা পোড়ানো ছাড়া আর কোন অনুষ্ঠান হতে দেখি না।’

একই গ্রামের বৃদ্ধা মালতি দাস বলেন- ‘ভোলাভুলি’র দিন আমরা গ্রামের সব বান্ধবিরা মিলে টুপাটুরি ভাত রান্না করতাম। মাঝ রাতে সবাই মিলে একসাথে আনন্দ করে খেতাম।’