অনিচ্ছা সত্ত্বেও বড় পরিসরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে এমন আভাস।

‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ জানায়, ‘ভুল-বোঝাবুঝি’র কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশ দুটির কূটনৈতিক তৎপরতায় যেকোনো মুহূর্তে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

পাকিস্তানি দৈনিক ডন জানিয়েছে, ওয়াশিংটন থেকে গত সপ্তাহে প্রকাশ হয় প্রতিবেদনটি। চার বছর পরপর প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে পরবর্তী ৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস দেয়া হয়। সে অনুযায়ী নীতি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেয়া হয় এতে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে বিচারকদের ওপর সাম্প্রতিক এক সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের এ ধরনের হামলার সক্ষমতা অর্জন, নয়াদিল্লির প্রতিশোধ আর ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা—সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যেই ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্পর্শকাতর সময়ে দেশ দুটির হিসাবনিকাশে যেকোনো ধরনের ভুল বড় ধরনের আঞ্চলিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেও সতর্ক করা হয় প্রতিবেদনে। এ ক্ষেত্রে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট অনেক বছর স্থায়ীও হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার আরও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানবিষয়ক নীতিমালাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এর প্রভাব পড়বে আফগানিস্তানের প্রায় সব প্রতিবেশী দেশে, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানে।

আফগানিস্তানের ধর্মভিত্তিক সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন তালেবান ও এর বিরোধীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। আর এ কারণে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক বিস্তার এবং অপরাধী চক্র ও শরণার্থীদের দেশ ছাড়ার প্রেক্ষাপট।

এছাড়া পাকিস্তানের পশ্চিমে আফগানিস্তান, ইরান ও চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদ বাড়তে পারে এ সুযোগে। এটিও ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা বাড়ার বড় কারণ হবে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। সঙ্গে আছে ভারত ও পাকিস্তানের সাধারণ সীমান্ত অঞ্চল কাশ্মীরে দেশ দুটির সেনাবাহিনীর আকস্মিক হস্তক্ষেপের শঙ্কা।

এসব কারণে আগামী পাঁচ বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক ও জ্বালানি খাত আরও নিম্নমুখী হবে বলে আভাস দেয়া হয় প্রতিবেদনে। সামগ্রিকভাবে এখনও বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বাণিজ্য সবচেয়ে নিম্নমুখী দক্ষিণ এশিয়াতেই।

পানি নিয়েও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০২৫ সাল নাগাদ পানির তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে পাকিস্তানে। সংরক্ষণে দুর্বল অবকাঠামো ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়াসহ নানা কারণে পানির জন্য ভারত থেকে প্রবাহিত উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়বে পাকিস্তানের।

এ ছাড়া আঞ্চলিক দুই শক্তি চীন-ভারত দ্বন্দ্বের জেরেও দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, আঞ্চলিক নেতৃত্বে নয়াদিল্লির প্রভাব খর্ব করে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ভারত মহাসাগরে চীনের কর্তৃত্বের বিপরীতে জাপানে বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করতে পারে ভারত।

আবার কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় চীনের পাশাপাশি সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কে গতি রক্ষা করতে চাইবে বিভিন্ন দেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার রপ্তানি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র বলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চাইবে না কোনো দেশই।

ভারসাম্য রক্ষার এ কূটনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রভাব বাড়তে পারে রাশিয়া, জাপানেরও।