হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার রিয়াজনগর গ্রামের বাসিন্দা শতবর্ষী মাবিয়া খাতুন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। নিজের পায়ে হাঁটারও জোর নেই। থাকতেন ছেলের কাছে। পান ব্যবসা করে অনটনে চলে ছেলের সংসারও। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সহ্য করতে হয় পুত্রবধূর অত্যাচার। শেষ পর্যন্ত ছেলে আর ছেলের বউ তাকে রেখে আসেন গাছতলায়।

খবর পেয়ে তিন দিন আগে সেখান থেকে বৃদ্ধা মাবিয়াকে বাড়ি ফিরিয়ে দেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক। তাকে দেয়া হয় হুইল চেয়ার, নতুন শাড়ি, খাবার ও নগদ অর্থ। এ সময় ছেলে আর ছেলের বউ পুলিশের কাছে অঙ্গীকার করেন বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করবেন না।

এদিকে, গাছতলা থেকে বাড়ি ফিরে আনন্দে উদ্বেলিত মাবিয়া খাতুন। এবার সেই বৃদ্ধার পাশে দাঁড়ালেন প্রবাসীরা। প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠিত সিলেটের জকিগঞ্জের ডা. আব্দুল হান্নান ট্রাস্ট তার খাবার, চিকিৎসাসহ ভরণপোষণের জন্য ১ লাখ টাকা অনুদান দেয়।

রোববার (২ মে) সকালে পুলিশ সুপার, ওসি, সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে বৃদ্ধা মাবিয়ার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এছাড়া তার সেবার জন্য স্থানীয় একজন মেয়েকে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছেন থানার ওসি মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি নিজে তার বেতন পরিশোধ করবেন বলে জানান।

আনন্দে উদ্বেলিত মাবিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার বয়স ১০০ ছাড়িয়েছে। আমার ছেলে ভালো হলেও পুত্রবধূ আমাকে খেতে দিত না। এমনকি এক গ্লাস পানিও দিত না। আমি অসুস্থ, চলতে পারি না টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না। এবার আমার সব সুযোগ হয়েছে। বাড়িতে উঠতে পেরেছি। খাবার পাচ্ছি। সেবা পাচ্ছি।’

এ সময় পুলিশ সুপারকে হাত ধরে তাকে বাবা সম্বোধন করে কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধা মাবিয়া।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা বলেন, ‘ছেলে আর ছেলের বউ মাকে গাছতলায় রেখে এসেছে। ফেসবুকে এমন মর্মান্তিক খবর দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বৃদ্ধার চলাচলের জন্য হুইল চেয়ার ও তার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।’

আর্থিক অনটন এবং সামাজিক অবক্ষয় থেকেই মা বাবার প্রতি সন্তানরা এমন আচরণ করছেন বলে মনে করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকেরই যার যার অবস্থান থেকে এমন মানবিক কাজে এগিয়ে আসা উচিত।’

মাধবপুর থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক জানান, পুলিশ সুপারের নির্দেশে বৃদ্ধার বিষয়টি অমরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখছি। তার সেবার জন্য একজন মেয়েকে মাসিক বেতনের ভিত্তিতে রাখা হয়েছে।

সিলেটের জকিগঞ্জের ডা. আব্দুল হান্নান ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহসিন জানান, পুলিশ সুপারের ফেসবুক পেজে দেখে জানতে পারেন এমন অমানবিক ঘটনার খবর। এরপর তার বড় ভাই ট্রাস্টের যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি আব্দুল মালিক নিজের বিবেকের তাড়না থেকে খবরাখবর নেয়ার জন্য বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা খবরাখবর নিয়ে জানালে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে তার জন্য খাবার ও নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হয়। এ ধরনের মানবিক একটি কাজে অংশ নিতে পেরে আমরা আনন্দিত।’