হেফাজত নেতা মামুনুল হকের রিসোর্টকাণ্ডের পর থেকেই কথিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ের দাবির সত্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন, সেটি আরও বড় হয়েছে রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে।

পুলিশ জানাচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদে মামুনুল তাদেরকে জানিয়েছেন, তিনটি শর্তে জান্নাত আরা ঝর্ণা ও জান্নাতুল ফেরদৌস লিপিকে চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করেছেন তিনি।

শর্ত তিনটি হলো: কখনও স্ত্রীর মর্যাদা চাওয়া যাবে না, সন্তান ধারণ করা যাবে না ও সম্পত্তির দাবিদার হওয়া যাবে না।

এই তিন শর্ত স্ট্যাম্পে উল্লেখ করে দুটি চুক্তিপত্র বানানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন মামুনুল হক।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম।

তিনি বলেন, ‘মামুনুল হক চুক্তির তিন শর্তের কথা আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে সেসব চুক্তিনামা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সেগুলো তার বাসায় আছে বলে তিনি জানিয়েছেন।’

গত ৩ এপ্রিল ঝর্ণাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের রয়্যাল রিসোর্টে যান মামুনুল। স্থানীয়দের হাতে অবরুদ্ধ হওয়ার পর তিনি তাকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে বলেন, দুই বছর আগেই বিয়ে করেছেন তারা।

তবে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম গোপন করেন তিনি। রিসোর্টের রেজিস্ট্রার বইয়ে ও স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, সঙ্গীনির নাম আমিনা তাইয়্যেবা। বাবার নাম জাহিদুল ইসলাম আর বাড়ি খুলনায়।

তবে পরে প্রকাশ পায় আমিনা তাইয়্যেবা হেফাজত নেতার চার সন্তানের জননী স্ত্রীর নাম। রিসোর্টের সঙ্গীনির নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা।

এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহে মামুনুলের বিয়ের দাবি যখন আরও প্রশ্নের মুখে, তখন ৮ এপ্রিল ফেসবুক লাইভে এসে বক্তব্য দিয়ে আরও বিপাকে পড়েন মামুনুল।

তিনি সেদিন বলেন, ‘আমি একাধিক বিয়ে করেছি। শরিয়তে ইসলামে একজন মুসলিম পুরুষকে চার চারটি বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। দেশি আইনেও চার বিয়ে করায় কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কোনো অনুৎসাহ নেই। কাজেই আমি যদি চারটি বিবাহ করি, তাতে কার কী?’

এর মধ্যে মামুনুলের আরও এক নারীর সঙ্গে গোপন সম্পর্কের কথা গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। তার ওই নারীর ভাইকে মাদ্রাসায় ডেকে নিয়ে হেফাজত নেতা দাবি করেন, তিনি তার বোনকেও বিয়ে করেছেন।

মামুনুলের দাবি সত্য হলেও ইসলামের শর্ত ভঙ্গ

ইসলামে একাধিক স্ত্রী রাখার সুযোগ থাকলেও কোনো স্ত্রীর সঙ্গে বৈষম্য না করার শর্ত আছে। কথিত চুক্তিতে যেসব শর্তের কথা তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সেটি ইসলামী শরিয়াসম্মত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

কারণ, কোরআনে একাধিক বিয়ে করার কথা যেখানে বলা আছে, সেখানে স্পষ্টতই কোনো স্ত্রীর সঙ্গে বৈষম্য না করার কথা বলা আছে।

কিন্তু এই চুক্তি সত্য হলে তাইয়্যেবার তুলনায় ঝর্ণা ও লিপির সঙ্গে মামুনুল স্পষ্টত বৈষম্য করেছেন। তিনি এই দুই জনকে কেবল সম্পত্তি থেকে নয়, মাতৃত্ব এবং স্ত্রীর পরিচয় থেকে বঞ্চিত করেছেন।

মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর মামুনুলকে তেজগাঁও থানায় নেয়া হয়।
অথচ গত ৮ এপ্রিলের লাইভে মামুনুল দাবি করেন, তিনি তার কথিত স্ত্রীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেননি। তাদেরকে কোনো অধিকার থেকে বঞ্চিত করেননি।

সেদিন তিনি বলেন, ‘আমি একাধিক বিবাহ করে যদি আমার স্ত্রীদেরকে কোনো অধিকার বঞ্চিত করে থাকি, তাহলে তারা অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ করতেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ কি কোথাও দেখাতে পারবেন যে, আমার কোনো স্ত্রী কোথাও আমার বিরুদ্ধে এতটুকু অভিযোগ করেছে যে আমি তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি?’

আইনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ

আবার এই বিষয়টি বাংলাদেশের আইনেও শাস্তিযোগ্য। মুসলিম পারিবারিক আইনে একাধিক বিয়ে করার সুযোগ থাকলেও সেটি শর্তহীন নয়। স্ত্রী বা স্ত্রীরা যদি সন্তান জন্মদান বা যৌন মিলনে অক্ষম হন, যদি গুরুতর মানসিক রোগে ভোগেন, তাহলে নানা শর্তে আরও বিয়ে করার সুযোগ আছে।

তবে এ ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রী বা স্ত্রীদের লিখিত অনুমতি লাগবে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে সম্মতিপত্র লাগবে, তার পর বিয়ে করা যাবে। আর বিয়ে অবশ্যই নিবন্ধিত হতে হবে।

এই শর্ত পূরণ না হওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আর্থিক সংকটের সুযোগ

গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাহবুব আলম বলেন, ‘তিন শর্তের বিনিময়ে তারা দুইজন মামুনুলকে শারীরিক সঙ্গ দেবেন আর মামুনুল তাদের আর্থিক দায়িত্ব নেবেন এমনটাই চুক্তিতে উল্লেখ ছিল বলে মামুনুল হক আমাদের জানিয়েছন।’

তিনি বলেন, ‘ওই দুই নারীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছিলেন মামুনুল। জান্নাত আরা ঝর্ণা ও জান্নাতুল ফেরদৌস লিপি দুজনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ ছিলেন মামুনুল। তাদের অর্থিক সংকটের কথা জানতেন তিনি। সুযোগ বুঝে তাদের অনৈতিক প্রস্তাব দেন তিনি। বিনিময়ে তাদের প্রতিমাসে আর্থিক নিশ্চয়তা ও কাজের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথাও দেন মামুনুল।’

রিমান্ড শুনানির জন্য ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তোলা হয় মামুনুল হককে। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস
সে অনুযায়ী জান্নাত আরা ঝর্ণাকে রাজধানীর একটি বিউটি পর্লারে ও জান্নাতুল ফেরদৌস লিপিকে মোহম্মদপুরের একটি মাদ্রাসায় চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন মামুনুল।

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তার ধারণা, সাহায্য করতে নয়, মামুনুল হক তার নারী আসক্তি ও চারিত্রিক স্খলন থেকেই এমনটা করেছেন।

কথিত বিয়ের সাক্ষী নিয়েও প্রশ্ন

মাহবুব আলম জানান, মামুনুল কথিত বিয়ে নিয়ে উঠা প্রশ্নের সদুত্তর তাদের কাছেও দিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘মামুনুল হক দাবি করেছেন, দুই চুক্তিভিত্তিক বিয়েতেই চাক্ষুষ স্বাক্ষীরা হাজির ছিলেন। তবে তাদের নাম পরিচয় জানতে চাইলে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেননি।’

দুই কথিত স্ত্রী আইনি পদক্ষেপ নেবেন কি না জানতে চাইলে গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘সে বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। তবে তারা যদি অভিযোগ দেন আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

ঝর্ণাকে তাইয়্যেবা বলে প্রতারণা কেন?

এই বিষয়টি নিয়েও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছ মামুনুলকে।

জবাবে তিনি বলেন, ঝর্ণা সম্পর্কে স্ত্রী আমিনা তাইয়্যেবা কিছু্ই জানেন না। তিনি শারীরিকভাবেও কিছুটা অসুস্থ। হঠাৎ একথা জানতে পারলে তার কোনো ক্ষতি হতে পারত ভেবে মিথ্যা বলেন।

এ বিষয়ে ৮ এপ্রিলের লাইভে অবশ্য মামুনুল অন্য কথা বলেছিলেন। তিনি দাবি করেন, স্ত্রীর কাছে সত্য গোপনের অধিকার তাকে ধর্ম দিয়েছে।

সেদিন তিনি বলেন, ‘ইসলামি শরিয়তের মধ্যেও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে যে, স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য, স্ত্রীকে খুশি করবার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে, সীমিত ক্ষেত্রে সত্যকে গোপন করারও অবকাশ রয়েছে।’

গ্রেপ্তার ও রিমান্ড

গত ১৮ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের নিজ মাদ্রাসা জামিয়া রহমানিয়া থেকে গ্রেপ্তার হন মামুনুল হক। পরদিন মোহাম্মদপুর থানার ২০২০ সালে করা একটি মামলায় তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত।

২০১৩ সালের মতিঝিল শাপলা চত্বরে তাণ্ডবের ঘটনায় ও সাম্প্রতিক নাশকতায় সারা দেশের মোট ২৩টি মামলায় মামুনুলকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

ধারাবাহিকভাবে সব মামলাতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে নিশ্চিত করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।