রাজধানীর ওয়ারীতে পরকীয়ার জেরে সজিব হাসান (৩২) নামের এক যুবককে হত্যার পর পাঁচ টুকরো করার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। ভিকটিমের খালু নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে ওয়ারী থানায় মামলাটি করেন।

শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ওয়ারী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. হান্নানুল ইসলাম গোলাপ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শাহনাজ বেগম পারভীনকে (৫০) আসামি করে মামলাটি করেন নজরুল ইসলাম। আমরা পারভীনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে আমাদের কাছে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। তাকে আজকে আদালতে প্রেরণ করেছি।

এদিকে আদালত সূত্রে জানা গেছে, দায়ের করা মামলায় শাহনাজ বেগম পারভীন দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার পুলিশ শাহনাজ বেগমকে আদালতে হাজির করে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করে।

আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ, বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওয়ারীর ১৭/১ কে এম দাশ লেনের একটি বাসায় সজিব হাসানকে প্রথমে কুপিয়ে হত্যা নিশ্চিত করার পর হাত পা শরীর পাঁচ টুকরো করে বাথরুমে ফেলে রাখেন শাহনাজ পারভীন।

পরে শাহনাজ পারভীনের স্বামীর দেওয়া খবরে ওয়ারী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাতেনাতে তাকে আটক করে এবং টুকরো করা মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং শাহনাজ পারভীনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়।

পুলিশ কমিশনার মো. হান্নানুল ইসলাম গোলাপ বলেন, গত পাঁচ বছর ধরে ওয়ারীর ১৭/১ কে এম দাশ লেনের ওই বাসায় বসবাস করেন সজিব হাসান। স্থানীয় এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শাহনাজ পারভীন কথিত স্ত্রী পরিচয়ে সজীব হাসানের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। স্থানীয়রা তাকে সজীব হাসানের স্ত্রী হিসেবে জেনে এসেছেন।

তবে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বামী জসিম উদ্দিন (৫৫) একজন শাহনাজ পারভীনকে স্ত্রী দাবি করে তার সন্ধান চেয়ে ওয়ারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি নং ৪৬৩)। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন যে, তার স্ত্রী শাহনাজ পারভীন অনেক দিন ধরে নিখোঁজ। ওই নিখোঁজ শাহনাজ পারভীন এর সন্ধানে তদন্ত করছিল ওয়ারী থানা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকালে সাধারণ ডায়েরি করা জসিম উদ্দিন ওয়ারী থানা পুলিশকে ফোন করে জানান, তার স্ত্রী শাহনাজ পারভীনকে ওয়ারীর একটি বাসায় আটকে রাখা হয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে ওয়ারী থানা পুলিশ অভিযানে গিয়ে ওয়ারীর ১৭/১ কে এম দাশ লেনের ওই বাসা থেকে পাঁচ টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে। পরে জানা যায়, ওই মরদেহটি সজীব হাসানের।

ওই ঘটনায় হাতেনাতে আটক করা হয় শাহনাজ পারভীনকে। শাহনাজ পরে পুলিশকে জানান যে, তিনি নিজেই সজিব হাসানকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা পর পাঁচ টুকরো করেন।

শাহনাজ পারভীনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সহকারী পুলিশ কমিশনার হান্নানুল ইসলাম গোলাপ আরও বলেন, ওই গ্রেপ্তার নারী শাহনাজ পারভীন প্রাথমিকভাবে পুলিশকে জানায় যে, তার সঙ্গে সজীব হাসানের দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরকীয়া সম্পর্ক। এই পরকীয়া সম্পর্কের জেরে তাদের মধ্যে অবাধ মেলামেশা এবং ওই বাসায় যাতায়াত ছিল। তবে এই সম্পর্কের জের ধরে সম্প্রতি সজিব হাসান তাকে ব্লাকমেইল করা শুরু করেন।

ব্ল্যাকমেইলের অংশ হিসেবে সজিব হাসান শাহনাজ পারভীনের কাছে টাকা দাবি করেন, নইলে অনৈতিক এ সম্পর্কের কথা সবাইকে বলে দেবেন। বৃহস্পতিবার সকালে আবার সজীব হাসানের বাসায় আসেন শাহনাজ পারভীন।

শাহনাজের দাবি, পেছন থেকে চাকু দিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন সজিব। তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তা প্রতিরোধ করেন, এবং ওই ধারালো অস্ত্রে সজিবকে আঘাত করেন। সজিবের পেটের ভুঁড়ি বেরিয়ে যায়। পরে আঘাতে আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর হাত, পা ও মাথা আলাদাসহ সজিবের মরদেহ পাঁচ টুকরো করে বাথরুমে ফেলে রাখেন।

প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এসি গোলাপ জানান, নিহত সজিব হাসান রাজধানীর সায়েদাবাদে শ্যামলী বাসের একটি কাউন্টারে কাজ করতেন। পাশাপাশি অভিযুক্ত ও হত্যাকারী শাহনাজ পারভীনের বুটিকসের ব্যবসায়ও সহযোগিতা করে আসছিলেন। সজিবের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। এই হত্যার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না এবং মূল কারণ জানতে পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।