দিনরাত ডেস্ক : রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটিসহ স্বাধীনতাবিরোধী ১০ হাজার ৭৮৯ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে স্থান পেয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা।

রোববার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাজাকারের নামের তালিকা ঘোষণা করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রেকর্ড সংগ্রহ করে রাজাকারদের তালিকা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকার সময় অনেক রাজাকার-আলবদরের রেকর্ড সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, রাজাকারদের নাম-পরিচয় নতুন প্রজন্মকে জানানোর জন্যই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, আমরা নতুন করে কোনো তালিকা করিনি। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং যেসব পুরনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করেছি। তৎকালীন বিভিন্ন জেলার রেকর্ড রুম থেকে এবং বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহের প্রচেষ্টা চলছে। যাচাই-বাচাই করে ধাপে-ধাপে আরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।

ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) তালিকাটি দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো তালিকা প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি। এরপরও যেসব দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই নাম প্রকাশ করা হবে। কোনো তালিকা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে প্রকাশ করা হবে না। অন্যায়ভাবে কেউ তালিকাভুক্ত হবে না।’

প্রথম দফার তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমসহ ওই সময় স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী অনেক রাজনৈতিক নেতার নাম আছে। নানা ক্যাটাগরিতে এদের নাম একাধিকবার তালিকায় এসেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- নুরুল আমীন, খান এ সবুর, মাহমুদ আলী, ওয়াহিদুজ্জামান, খাজা খায়রুদ্দিন, কাজী আবদুল কাদের, রাজা ত্রিদিব রায়, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, একেএম সামসুল হক, অংশু প্রু চৌধুরী, আব্বাস আলী খান, একিউএম শফিকুল ইসলাম, সৈয়দ সাজ্জাব হোসাইন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মো. আলমগীর, লাল মিয়া, আলী হায়দার মোল্লা, এটিএম আবদুল মতিন, মোহাম্মদ আলী, শহিদুল্লাহ, আনম ইউসুফ, শামসুল হুদা, এমএ মতিন, খররম জা মুরদাদ, এমএ শিকদার, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সেরাজুদ্দীন, আজগর হোসেন প্রমুখ।

স্বাধনীতার পর গত ৪৮ বছরে ছয়বার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ড পাল্টেছে ১১ বার। সর্বশেষ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ‘প্রকৃত’ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, আবেদনকৃত ও তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিরীক্ষণ এবং তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে উপজেলা, জেলা/মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটি করেছে সরকার।

এ কাজে চারটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ঠিক হয়, ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা, বেসামরিক গেজেট ও বাহিনীর গেজেট- এই চারটি তালিকার অন্তত একটিতে নাম থাকলে তবেই একজন ব্যক্তির নাম আসবে চূড়ান্ত তালিকায়। এরপর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত করতে সরকার সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে।

কিন্তু আইনি জটিলতায় ১১৬টি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। আবার অনেক কমিটির প্রতিবেদনে অসঙ্গতি ও ভুল-ত্রুটি থাকায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আপত্তি আসায় অসঙ্গতি দূর করতে গঠন করা হয় আরেকটি কমিটি। আওয়ামী লীগের গত মেয়াদের শেষ বছর ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আর হয়নি।