দিনরাত ডেস্ক : হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরীবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রুককুন উদ্দিনের কন্যা রাজধানীর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পার মৃত্যুর রহস্য এখনো উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় রুম্পার প্রেমিক আব্দুর রহমান সৈকতকে গ্রেফতার করা হলেও আপাতত ‘আত্মহত্যা’য় আটকে আছে তদন্ত। রুম্পার মৃত্যুর ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও সে কোন ভবনটি থেকে নিচে পড়েছিল, এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা।

গত ৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত পৌনে ১১টার দিকে সিদ্ধেশ্বরীর সার্কুলার রোডের ৬৪/৪ নম্বর বাসার নিচে অজ্ঞাত মরদেহ দেখে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

পরদিন ৫ ডিসেম্বর পুলিশ রুম্পার পরিচয় নিশ্চিত করে। তার বাবার নাম রোকন উদ্দিন। তিনি হবিগঞ্জ এলাকায় পুলিশ ইনসপেক্টর হিসেবে কর্মরত। রুম্পার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায় হলেও রাজধানীর মালিবাগের শান্তিবাগ এলাকার ২৫৫ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে মা-ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন।

রুম্পার মরদেহ উদ্ধারের পরদিন রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্তভার পায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির রমনার জোনাল টিমের পরিদর্শক শাহ মো. আকতারুজ্জামান ইলিয়াস। তিনি বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়া হবে।’

এদিকে তদন্তের শুরুতে রুম্পার প্রেমিক আব্দুর রহমান সৈকতকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এটি ‘আত্মহত্যা’ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

রুম্পার সাথে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়ে সৈকত রিমান্ডে পুলিশকে জানান, ঘটনার দিন দুপুরে রুম্পার সাথে তার দেখা হয়েছিল। সেখানে রুম্পাকে সৈকত বলেছেন, ‘তোমার সাথে আজ আমার শেষ দিন। আমাদের আর দেখা হবে না। আমি ব্রেকআপ করছি’। তবে রুম্পা এই সম্পর্কে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন, তিনি কোনোভাবেই সৈকতকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছিলেন না। তিনি কয়েকবার সৈকতকে সম্পর্ক না রাখলে ‘আত্মহত্যা করবেন’ বলে হুমকিও দেন।

ডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও এ পর্যন্ত হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে দ্বিধা-ধন্দে আছে খোদ তদন্ত টিম।’

এদিকে রুম্পার নিথর দেহ সিদ্ধেশ্বরীর সার্কুলার রোডের যে ৬৪/৪ নম্বর ভবনের নিচে পড়ে ছিল, তার সাথে আরও দুইটি ভবন লাগোয়া। প্রাথমিকভাবে এই ভবন থেকে রুম্পা নিচে পড়েছেন ধারণা করা হয়। তবে ডিবি বলছে, তিনটি ভবনের কোনটি থেকে তিনি লাফ দিয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

তদন্ত সূত্র জানায়, ৪ ডিসেম্বর রাতে টিউশনি শেষে শান্তিবাগের নিজের বাসার নিচে গিয়ে ভাইয়ের হাতে কানের দুল, আংটি আর মোবাইল ফোন দেন রুম্পা। এরপর সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডে যান। রুম্পা কেন সেখানে গিয়েছিলেন, এ প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, সিদ্ধেশ্বরীর ৬৪/৪ নম্বর বাড়ি অর্থাৎ যে ভবনের নিচ থেকে রুম্পার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে তার একজন স্কুলবান্ধবী থাকতেন। সেই বান্ধবীও একজন পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে। তিনি একসময় রুম্পার সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুলে পড়তেন।

রুম্পার মৃত্যুর বিষয়ে ৬৪/৪ নম্বর বাড়ির আট জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ছয়জন ব্যাচেলর। তারা ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থাকতেন। তারা পুলিশকে জানান, রাত আনুমানিক পৌনে ১২টায় হঠাৎ ওপর থেকে কিছু একটা পড়ার শব্দ পান তারা। প্রায়ই ওই ভবনের ওপরতলা থেকে সড়কে ময়লাভর্তি পাটের বস্তা ফেলা হতো বিধায় তারা ভেবেছিলেন, সেদিনও একই ঘটনা ঘটে। যে বস্তা ফেলেছে তাকে শনাক্ত করতে ঘরের বারান্দায় বের হন তারা ছয় জন। তবে বারান্দায় গিয়ে তারা এক তরুণীকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর তারা দেখেন, কয়েকজন লোক এক স্থানীয় ডাক্তার নিয়ে এসেছে।

এছাড়া তারা কাউকে দৌড়ে পালাতে বা সন্দেহভাজন কাউকে দেখেননি বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন।

পুলিশের কাছে রুম্পার পরিবার ও ভাইয়ের জবানবন্দীতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাসা থেকে ৪-৫ মিনিট দূরত্বের একটি ফ্ল্যাটে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতেন তিনি। ৪ ডিসেম্বর বিকেলেও বাসা থেকে বেরিয়ে প্রাইভেট পড়াতে যান রুম্পা। এক ঘণ্টা পড়ানোর পর বের হয়ে বাসার নিচে গিয়ে রুম্পা তার মাকে ফোনে বলেন, চাচাতো ভাইকে দিয়ে বাসার নিচে যেন একজোড়া স্যান্ডেল পাঠানো হয়। ১০ বছরের চাচাতো ভাই একজোড়া স্যান্ডেল নিয়ে নিচে নামে। ওই স্যান্ডেল বদল করে পায়ে দেন রুম্পা। এরপর তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, আংটি, হাতঘড়ি ও ব্যাগ চাচাতো ভাইয়ের কাছে দেন এবং চলে যান। রাতে বাসায় না ফেরায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।

মামলার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা শাহ মো. আকতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পাশাপাশি তিনটি ভবন, ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা বলতে পারবো কোন ভবন থেকে সে নিচে পড়েছিল। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলার সময় এখনো হয়নি।’

সাথে রুম্পার বাবা হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরীবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. রুককুন উদ্দিন, তার মা কিংবা পরিবারের লোকজনের কথা হলেও তদন্তের বিষয়ে তারা কোনো কথা বলেননি।

এদিকে রুম্পার ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, তার হাত, পা, কোমরসহ শরীরের কয়েক জায়গার হাড় ভাঙা ছিল। এছাড়া মৃত্যুর পূর্বে তাকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

এদিকে যে বাড়ির প্রধান গেটের সামনে রুম্পার লাশ পড়েছিল সেই বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, এখনো ভবনটির নির্মাণকাজ চলছে। ছাদের চারদিকে কোনো রেলিং নেই। এই ছাদে হাঁটাচলা করাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।