সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করতে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সমর্থকদের জড়ো করা হয় মসজিদে মাইকিং করে।

হেফাজত নেতারা আশ্বাস দিয়েছিলেন, তারা কেবল মিছিল করে চলে আসবেন। আর এই কথায় বিশ্বাস করে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

হামলার পর এখন এলাকার নিরাপত্তায় নানা ব্যবস্থার কথা বলা হলেও আগের নিষ্ক্রিয়তার জুতসই কোনো জবাবই নেই কারও কাছে।

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা হিন্দু অধ্যুষিত। উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। এর মধ্যে হবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের সবাই এই ধর্মের অনুসারী। গ্রামে ঘর আছে শ খানেক। কিন্তু একটিও পাকা বাড়ি নেই। এখানকার বাসিন্দাদের সবাই পেশায় কৃষি ও মৎস্যজীবী।

এই গ্রামের এক তরুণ মঙ্গলবার হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। তাতে মামুনুলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতার অভিযোগ আনা হয়।

গত ১৫ মার্চ শাল্লার পাশের দিরাইয়ে সমাবেশ করে হেফাজত। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা মামুনুল ওই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। পরদিনই নোয়াগাঁও গ্রামের ওই তরুণের স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার রাত থেকেই এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার সকালে এলাকায় বিক্ষোভের ঘোষণা দেয় হেফাজত।

উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে নোয়াগাঁও গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। তারা ফেসবুকে পোস্ট দেয়া তরুণকে রাতেই পুলিশের হাতে তুলে দেন।

তবে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আর আতঙ্ক সত্ত্বেও ওই গ্রামের নিরাপত্তায় প্রশাসনের কোনো ‘উদ্যোগ’ ছিল না। ছিল না পুলিশের বাড়তি ‘নজরদারি’।

যে কারণে বুধবার সকালে নোয়াগাও গ্রামে হামলার সময় মামুনুল হকের অনুসারীদের কোনো রকম বাধার মুখেই পড়তে হয়নি। কয়েক হাজার মানুষ দা-লাঠিসহ মিছিল নিয়ে এসে ভাঙচুর করে ৮৭টি হিন্দু বাড়ি। এসব ঘর থেকে টাকাপয়সা-স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় তারা।

হামলাকারীরা ঘর তছনছ করে দিয়েছে অসীম চক্রবর্তীর। তার অভিযোগ, পুলিশ আগে থেকেই ব্যবস্থা নিলে এমন তাণ্ডব ঘটত না।

স্থানীয় একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, হামলার পরও হামলাকারীদের ধরতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। বরং তাদের নির্বিঘ্নে চলে যেতে পুলিশ সহায়তা করে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, হেফাজত নেতাদের আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তবে পুলিশ সব সময় সতর্ক ছিল।

শাল্লার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-মুক্তাদির হোসেন বলেন, ‘ফেসবুক স্ট্যাটাস ঘিরে মঙ্গলবার রাত থেকেই উত্তেজনা ছিল। উত্তেজনার খবর পেয়ে রাতেই আমরা হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে বসি। তখন তারা মিছিল না করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

‘এমন আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু সকালে হঠাৎই মিছিল বের করে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় কারা জড়িত তা তদন্ত করে বের করা হবে।’

একই দাবি করে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা রাতে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে বসেছি। তারা মিছিল করবেন না কথা দিয়েছিলেন।

‘সকালে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যখন পুষ্পস্তবক অর্পণ করছিলাম, তখনই মিছিলের খবর পাই। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মিছিলকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু লোক নদী সাঁতরে পার হয়ে বাড়িঘরে হামলা চালায়। তখন পুলিশের করার কিছু ছিল না।’

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের স্থানীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘রাতেই উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সকালে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তারপরও ওই গ্রামবাসীর নিরাপত্তায় পুলিশের আগাম ব্যবস্থা না নেয়া রহস্যজনক। পুলিশ তৎপর থাকলে এমন ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।’

হামলার শিকার নোয়াগাঁও ও তার আশপাশের গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের লোকজন জানিয়েছেন, বুধবার সকালের বিক্ষোভ মিছিল ও হামলায় পাশের দিরাই উপজেলার লোকজনই বেশি ছিল।

দিরাইয়ের নাচনি, চণ্ডীপুর, সরমঙ্গল, কাশিপুর, সন্তোষপুর এবং শাল্লা উপজেলার কালিমপুর, কাশিপুর গ্রাম থেকেই এসেছিল বেশিরভাগ মিছিলকারী। এই মিছিল থেকেই কিছু লোক নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

হামলাকারীরা ভাঙচুর করেছে পরিমল মজুমদারের বাড়ি। তিনি বলেন, ‘ঘর ভাঙার পাশাপাশি আমার ঘরে থাকা হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের টাকাগুলোও ছিনিয়ে নিয়েছে হামলাকারীরা।’

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীদের আমি চিনতে পারিনি। আমাদের আশপাশের গ্রামের হলে চিনতে পারতাম।’

হামলার পর বিকেলে শাল্লায় যান সুনামগঞ্জের সাংবাদিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মী শামস শামীম। তিনি বলেন, ‌‘হামলাকারীদের বেশির ভাগই এসেছে দিরাইয়ের নাচনি গ্রাম থেকে। সকালে গ্রামের মসজিদে মাইকিং করে এই মিছিলে অংশ নেয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়।’

ভাঙচুরকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদও। তিনি বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার রাতেই পরিস্থিতি শান্ত করি। তারা মিছিল করবে না বলে আমাদের আশ্বাস দেয়। কিন্তু সকালে কিছু ছেলেপেলে এই ঘটনা ঘটায়।

‘মিছিলের খবর পেয়ে সকালেই আমি ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে বিক্ষুব্ধ লোকদের উদ্দেশে বক্তব্যও রাখি। এমন সময় কিছু লোক হামলা চালায়।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েও হামলা ঠেকাতে না পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তখন পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইর চলে গিয়েছিল।’