স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ। এক সময়কার ‘বাস্কেট কেস’ রূপ নিচ্ছে উন্নয়নশীল দেশে। এ অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছেন সাবেক তিন অর্থমন্ত্রী। তিনজনই সিলেট অঞ্চলের। তারা হলেন এম সাইফুর রহমান, শাহ এএমএস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। নব্বই-পরবর্তী উত্তরণকালের বড় একটি সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভার সামলেছেন তারা। নিয়েছেন নানা সাহসী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ। এসব সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপকে কাজে লাগিয়ে এগিয়েছে দেশের ব্যক্তি খাত।

স্বাধীনতার পর অনেকটা শূন্য থেকে যাত্রা করে দেশের অর্থনীতি। ফলে পুনর্নির্মাণই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাকে আরো দুরূহ করে তোলে সম্পদের ঘাটতি। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে এ চ্যালেঞ্জ আরো বড় হয়ে ওঠে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে স্বাধীনতার পরের দুই দশকের গল্পটি অনেকটাই স্থবিরতা বা শ্লথতার।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের শুরু নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর। মূলত তখনই শুরু হয় দেশের অর্থনীতির খোলনলচে বদল। উদারীকরণ ঘটে বাণিজ্যনীতির। সংস্কার আসতে শুরু করে কর ব্যবস্থায়। ক্রমেই উত্তরণ ঘটে সার্বিক অর্থনীতির। এ উত্তরণের অন্যতম প্রধান তিন কারিগর সাবেক তিন অর্থমন্ত্রী- এম সাইফুর রহমান, শাহ এএমএস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত।

একজন অর্থমন্ত্রী কখনই জনপ্রিয় হন না। এমনটাই মনে করছেন সাবেক সচিব ও অধ্যাপক এম ফাওজুল কবির খান। তার মতে, এটি একজন অর্থমন্ত্রীর অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। আরেক বৈশিষ্ট্য হলো সরকারপ্রধানের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া। এ দুই বৈশিষ্ট্য এম সাইফুর রহমান, শাহ এএমএস কিবরিয়া ও আবুল মাল আবদুল মুহিত-তিনজনেরই ছিল।

এম ফাওজুল কবির খান বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রীদের মধ্যে এম সাইফুর রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশের শুল্ক ও কর ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলার শুরু। ব্যবসা-বাণিজ্যের উদার নীতিগুলোও প্রণয়ন শুরু করেন তিনি। চরম বিরোধিতার মধ্যেও কঠোরভাবে তিনি তার সংস্কার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করেছেন।

এম সাইফুর রহমানের সময় দেশে বাণিজ্য খাতের উচ্চ শুল্কহার হ্রাস পায়। নির্দিষ্ট শুল্কহারের বদলে প্রবর্তন হয় মূল্যভিত্তিক শুল্কহারের। কমানো হয় করহারের সংখ্যা। পরিবর্তন আসে আমদানি নীতিতেও। বেশির ভাগ পণ্যের আমদানি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ছোট হয়ে আসে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা। আবগারি করের পরিবর্তে প্রবর্তন করা হয় মূল্য সংযোজন করের। হ্রাস পায় আয়করের উচ্চহার।

এম সাইফুর রহমানের জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর। জন্মস্থান মৌলভীবাজার মহকুমার সদর উপজেলার বাহারমর্দন গ্রাম। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। লন্ডনে পড়াশোনা করেন ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। সেখানে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে। রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই। সলিমুল্লাহ হলে ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে পেশাজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সাইফুর রহমান। ১৯৬৯ সালে তত্কালীন পাকিস্তানে জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য হন তিনি। ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ছিলেন। সে সময়ই প্রথম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। পরে ১৯৭৬ সালে সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান।

নব্বই-পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা এম সাইফুর রহমানের হাতে। তার পদক্ষেপগুলোর সপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন শাহ এএমএস কিবরিয়াও। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। তার সময়ে অর্থনীতিতে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়ে। প্রচলন হয় বয়স্ক ভাতারও।

শাহ এএমএস কিবরিয়ার জন্ম ১৯৩১ সালের ১ মে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জালালশাপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা শাহ ইমতিয়াজ আলী ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা। মেধাবী ছাত্র কিবরিয়া ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দুই বারই তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। তিনি ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন একজন কূটনীতিক। দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন দেশে। আওয়ামী লীগে যোগ দেন ১৯৯৪ সালে। মনোনীত হন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। দল নির্বাচনে জেতার পর সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

সিলেট অঞ্চল থেকে আরেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি। মা-বাবা দুজনই তত্কালীন সিলেট জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের এমসি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রির পর ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিদেশে চাকরির সময়ে অধ্যয়ন করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬০-৬৯ পর্যন্ত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ থেকে এসকাপের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে সিলেট-১ আসনে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি।

সাবেক এ তিন অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মূল্যায়ন, তাদের আমলে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতির আর্থসামাজিক ইস্যুগুলোয় নীতিসহায়তার ক্ষেত্রে তাদের এক ধরনের অবদান ছিল। তবে আমার মনে হয় এখানে আরো কিছু করার অবকাশ রয়েছে।

আর্থিক খাতের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেই কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের। তিন অর্থমন্ত্রীর সময়ের মূল্যায়ন করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, তারা প্রত্যেকেই দেশের অর্থনৈতিক নীতিপ্রণয়ন ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। ধারাবাহিকভাবে তারা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছেন। তিনজনই রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন। এর মধ্যে সাইফুর রহমানের মেয়াদে আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ছিলাম। আমি মনে করি, দেশের আর্থিক খাতের মৌলিক সংস্কারগুলো তার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। শাহ এএমএস কিবরিয়া শান্ত প্রকৃতির ছিলেন। তিনি কম কথা বলতেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তাদের সমীহ করতেন। আর আবুল মাল আবদুল মুহিত গণমাধ্যমসহ সবক্ষেত্রেই খোলামেলা কথা বলতে পছন্দ করতেন। এজন্য তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছিল।

সূত্র: বণিক বার্তা