নদ-নদীকে জলমহাল হিসাবে ইজারা দেয়ার প্রথা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট শাখা ও ওয়াটারকিপার বাংলাদেশ ও সারি নদী বাঁচাও আন্দোলন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রাতারগুল জলারবন সংলগ্ন কাফনা ও সারী-গোয়াইন নদীর মিলনস্থল হিসাবে পরিচিত চিরিঙ্গিঘাটে সোমবার (১৫ মার্চ) দুপুর ২টায় আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস-২০২১ উপলক্ষ্যে সংগঠনগুলো স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে আয়োজন করা গ্রামীণ নাগরিক সভায় এই দাবি করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর কো-অর্ডিনেটর শরীফ জামিলের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সোমবার কাফনা নদী ও রাতারগুল জলাবন পরিদর্শন শেষে আয়োজিত গ্রামীণ নাগরিক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রাহক ও ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন চৌধুরী মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা শাহজামান চৌধুরী বাহার।

গ্রামীন নাগরিক সভায় বক্তারা বলেন, প্রবহমান পানির ধারাকে বাধাগ্রস্থ করা যাবে না। রাষ্ট্রের পক্ষে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে হোক নদীর কোনো অংশ বিক্রি বা ইজারা দেয়ার আর কোন সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদী একটি জীবন্ত সত্বা। সেই নদীকে মৃত দেখিয়ে জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়া দেশ ও দশের জন্য ক্ষতিকর হবে। বক্তারা বলেন, সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত কাপনা নদী সহ সিলেট অঞ্চলে জলমহাল হিসাবে লীজ দেয়ার তালিকায় নেয়া সকল নদী ও পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ হাওর ও জলাধার ঢালাও ভাবে ইজারা দেয়া বন্ধ করতে হবে।

সভার শুরুতে সারি নদী বাঁচাও আন্দোলন-এর সভাপতি আব্দুল হাই আল হাদি বলেন, জাতীয় একটি দৈনিকে গত ১লা মার্চ, ২০২১ ইং তারিখে জলমহাল ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। জৈন্তাপুর ভূমি অফিস থেকে প্রকাশিত এ বিজ্ঞপ্তিতে ২০ একর পর্যন্ত ২৯টি জলমহালের যে তালিকা রয়েছে, তার মধ্যে কাপনা নদীর নাম রয়েছে। এছাড়াও এতে লাল শাপলার বিলখ্যাত কেন্দ্রী হাওরের কুলিখাল ও পুঙ্গাখালের নাম রয়েছে। রয়েছে আগফৌদের তেলীখাল ও দিগারাইলের ভাতুখালের নাম। বিজ্ঞপ্তি মতে, কাপনা নদীর উমনপুর হাওর এলাকার ৭.৭০ একর এলাকার ইজারার আবেদন আহবান করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় একটি দৈনিকে জলমহাল ইজারার একটি বিজ্ঞপ্তি ৩ মার্চ, ২০২১ ইং তারিখে প্রকাশিত হয়। খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেট, সিলেট-এর মোতওয়াল্লীরকার্যালয় থেকে প্রকাশিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, ২৬ টি জলমহালের তালিকার মধ্যে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের কালনী নদী (কুশিয়ারা নদী) প্রকাশিত বিবিয়ানা নদী, নোয়াগড়ের নদী ওখাগড়াকোনা নদী, নলাই নদী, সুটা নদী ভাটিগাং, সুনামগঞ্জের শাল্লার সুরমা নদীসহ কয়েকটি খালের নাম দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে অন্যান্য এলাকায়ও অনুসন্ধান করলে একই চিত্র দেখতে পাওয়া যাবে। খাস জলাশয় এবং জলমহাল ইজারা দেওয়ার জন্য সরকারের নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু নদীকে ’জলমহাল’ হিসেবে ইজারা দেয়া কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

বাপা’র সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, রাতারগুল জলারবন-এর বাস্তুতন্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত কাফনা নদীকে সম্প্রতি জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসন জলমহাল হিসাবে ইজারা দিতে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে টেন্ডার দিলে পরিবেশ ও নদীকর্মীদের ক্ষুব্ধ করে। আমরা বাপা’র পক্ষ থেকে এই নদীর অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করতে এসেছি। এই প্রবহমান নদীকে কোন বিবেচনায় ইজারা দেয়া হচ্ছে, আমরা জানতে চাই। তিনি আরো বলেন, সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার ‘আন্দুগাং’ বলে পরিচিত একটি বাস্তুতন্ত্র সমৃদ্ধ লেইক ও জৈন্তাপুর উপজেলার লাল শাপলার বিলখ্যাত কেন্দ্রী হাওরের কুলিখাল ও পুঙ্গাখালকেও সম্প্রতি ইজারা দেয়ার বিজ্ঞপ্তি হয়েছে। আমরা এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষার দাবি জানাই। আমরা মনে করি, দেশের পানি ও জলজ সম্পদ রক্ষা করতে হলে এদের স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে হবে। ইজারা দেয়ার মাধ্যমে এ সকল জলাধার ও নদী ইজারাদারদের হাতে এমন ভাবে তুলে দেয়া যাবে না, যা ঐ জলাশয়কে বিপন্ন করে। দেশের নদ-নদী ও প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে লুটেপুটে খাওয়ার ভাবনা বদলাতে হবে।

বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, কয়েক বছর পূর্বে মৌলবীবাজার জেলার গোগালীছড়া নদীকে এইভাবে বদ্ধ জলাশয় দেখিয়ে ইজারা দেয়ার চেস্টা করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় মানুষকে নিয়ে বাপা সেখানে আন্দোলন করে এবং ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করানো হয়। কাফনা সহ অন্যান্য নদীকে ইজারার হাত থেকে বাঁচাতে এবারো আন্দোলন শুরু করা হলো।

সভায় স্থানীয়দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদ আহমদ শামিম, হাজি মদরিস আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো এনামুল হক এনাম ও ফয়েজ উদ্দিন, স্থানীয় গ্রামবাসী ফখরুল ইসলাম ও ফজলু মিয়া প্রমুখ।