প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বি। স্বপ্নের নগরী হবে হবিগঞ্জ পৌরসভা। এখানকার পরিবেশ হবে প্রকৃতির মতোই সবুজ-সতেজ আর বিষমুক্ত। কিন্তু সেই স্বপ্নের কতটুকু বাস্তবায়ন ঘটেছে। পৌরবাসী বলছেন, স্বপ্নের নগরী হওয়াতো দূরের কথা এখানে বাঁচতে হচ্ছে হাই-হোতাশ করে। পৌরসভার চেয়ার বদল হয়েছে অনেকবার কিন্তু বদলায়নি পৌরবাসীর ভাগ্য।

বিভিন্ন সমস্যার সাথে লড়াই করে বসবাস করতে হচ্ছে প্রথম শ্রেণির এই পৌসভার নাগরিকদের। বছর বছর ট্যাক্স বাড়লেও বাড়েনি নূণ্যতম সুযোগ-সুবিধা। অপ্রসস্থ রাস্তা-ঘাট, যানজট, অকেজু ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপ, অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যার সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

১৮৮১ সালে ৯.৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে হবিগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়। পরে ১৯৯০ সালে হবিগঞ্জ পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নিত করা হয়। এ পৌরসভায় জনসংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার।

যানজটে নাকাল শহরবাসী

হবিগঞ্জ পৌরসভার সবচেয়ে বড় সমস্যা যানজট। এই পৌরসভার সড়কগুলো অত্যান্ত অপ্রসস্থ হওয়ার কারণে দিনের পর দিন যানজট লেগে থাকে। যে কারণে বর্তমানে যানজটের শহরে পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জ। হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার সামন থেকে চৌধুরী বাজার পর্যন্ত মাত্র দেড় কিলোমিটারের রাস্তা। অথচ এই সড়কে প্রতিদিন চলাচল করছে ৫ হাজারেরও অধিক টমটম ইজিবাইক। সেই সাথে কয়েক হাজার সাধারণ রিক্সাতো আছেই। অপ্রসস্থ রাস্তা হওয়ার কারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ রাস্তায় যানজট গেলেই থাকে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, ছোট শহর হবিগঞ্জে ১২শ’ টমটম ইজিবাইকের বেশি চলাচল করা সম্ভব নয়। অথচ ৫ হাজারের অধিক টমটম ইজিবাইকের অনুমোদন রয়েছে এ পৌরসভা। এর মধ্যে নতুন করে সম্প্রতি আরও শতাধিক টমটম ইজিবাইকের অনুমোদন দিয়েছে পৌরসভা। যে কারণে যানজটের জন্য স্বয়ং পৌরসভাকেই দায়ি করছেন তারা।

হবিগঞ্জ পৌরসভার শ্যামলি এলাকার পল্লব চৌধুরী বলেন, ‘শহরের যানজটের অবস্থা কি বলব। প্রতি বছর টেক্স ভেড়ে দ্বিগুণ হয়। বাড়ি বানাতে টেক্স লাগে, গাছ কাটতে টেক্স লাগে, কিন্তু এত টাকা টেক্স দিয়েও আমাদের নূন্যতম সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পায়নি। যানজটের কারণে শহরে বের হওয়া যায় না।’

মামুনুর রহমান নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘হবিগঞ্জ ছোট একটা শহর। অথচ এই শহরে প্রতিদিন ৫ হাজার বেশি টমটম চলাচল করে। এই যানজটের কারণে কে দায়ি? অবশ্যই পৌরসভাই নিজেই দায়ি। কারণ তারা এতগুলো টমটমের অনুমোদন না দিলে চলাচল করতে পারত না।’

অকেজু ড্রেনেজ ব্যবস্থা

হবিগঞ্জ শহরে ৫৩.৬ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ ড্রেনের অবস্থাই নাজুক। হবিগঞ্জ শহরের প্রধান দুটি সড়কের দুইপাশের ড্রেনগুলোর অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। কোথাও ড্রেন ভেঙে গেছে, কোথাও ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনগুলো সংস্কার ও পরিস্কার না করার কারণে পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। যে কারণে অল্প বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডের ড্রেনের অবস্থা একই। ছোট ছোট ড্রেনগুলো ময়লা আবর্জনায় ভরে আছে। বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও এগুলো পরিস্কারে হাত দেয়নি পৌরসভা। এছাড়া পৌরসভার চিড়িয়াকান্দি, কর্মকার পট্টি ও ইনাতাবাদ এলাকায় বড়বড় ড্রেনগুলোর অবস্থাও একই রকম। পানি নিষ্কাশনের পরবর্তী উল্টো ড্রেনগুলোতে ময়লা পানি জমে দূর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে বাসা বেধেছে মশা-মাছিসহ বিভিন্ন বিষাক্ত পোকামাকড়।

অকেজু ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নিষ্কাশন হতে না পারায়, পানিতে তলিয়ে যায় সার্কিট হাউজ, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পানি উন্নয় বোর্ডের অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও। এছাড়া, মাস্টার কোয়ার্টার, ইনাতাবাদ, শ্যামলী, অনন্তপুর, নিউ মুসলিম কোয়ার্টার, ঝিলপাড়সহ শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়িতেও পানি ঢুকে যায়।

স্থানীয়রা বলছেন, পৌর এলাকায় গত ১০ বছরে অন্তত ৫০টির অধিক পুকুর, জলাশয় ও খাল ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বাসাবাড়িসহ নানা স্থাপনা। ফলে বৃষ্টির পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে কর্মকার পট্টির বাসিন্দা বিপ্লব রায় সুজন বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে আছে। অথচ আমরা কাউন্সিলরসহ মেয়রকে বারবার বললেও তারা ড্রেনগুলো পরিস্কারের কোন ব্যবস্থাই নেননি।’

তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি হলে এসব ড্রেনের ময়লা পানি রাস্তাঘাটে উঠে আসে। এসব মারিয়েই চলাচল করতে হয় সাধারণ মানুষসহ স্কুল-কলেজের শিক্ষর্থীদের। এতে বিভিন্ন ধরণের চর্মরোগে আক্রন্ত হচ্ছে শিশুরা। এছাড়া মশামাছির উপদ্রবে এলাকা ছাড়ার উপক্রম।’

চিড়াকান্দি এলাকার বাসিন্দা এলাকার সৈয়দ ইব্রাহীম বলেন, ‘মাত্র ১ ঘন্টা সময় বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাট ডুবে যায়। এ সময় ড্রেনের যত ময়লা আবর্জনা আছে সবগুলো রাস্তায় উঠে আসে। কোন কোন বাসা বাড়িতেও এসব ময়লা পানি ঢুকে যায়। আমরা কতটা কষ্টে আছি সেটা কেবল আমরাই জানি।’

গলার কাটা ময়লার-আবর্জনা

ময়লা-আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জ শহর। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপের পাশাপাশি পুরো শহরের ময়লা ফেলা হচ্ছে খোয়াই নদীর পাড় ও বাইপাস সড়কের দুইপাশে। কয়েক বছর আগে জমি কিনেও নানা জটিলতায় থমকে আছে হবিগঞ্জ পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ।

যে কারণে শহরে গৃহস্থলি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, হাসপাতাল-ক্লিনিক, শিল্প-করখানা, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ব্যাপক পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব ময়লা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এনে পৌরসভার ট্রাক ও ভ্যানে করে জেলা আধুনিক স্টেডিয়াম এলাকার বাইপাস সড়কের দু’পাশে ও খোয়াই নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে।

এসব ময়লার দুর্গন্ধে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বাইপাস সড়কটি। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে জেলা আধুনিক স্টেডিয়াম, জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বৃন্দাবন সরকারি কলেন, আদালত, আনসার ভিডিবি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায়। এতে ক্ষোভের অন্ত নেই স্থানীয়দের মাঝে। এমনকি বাইপাস সড়কের দুইপাশে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে কয়েকবার চিঠি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। সেই সাথে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনতো আছেই। কিন্তু তাতেও কোনো ফল মিলছে না।

কবি ও লেখক তাহমিনা বেগম গিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জ একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। অথচ এ পৌরসভার নাগরিকদের সমস্যার শেষ নেই। যানজট, দখল, দুষণ, যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যার সাথে প্রতিদিন লড়তে হয় পৌরসভার বাসিন্দাদের। অথচ সমস্যাগুলো সমাধানে পৌর কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যাথাই দেখা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘দিনদিন পৌরসভার উন্নয়নের বদলে আমার মনে হচ্ছে অবনতি হচ্ছে। নদী-নালা-খাল দখল করে গড়ে উঠছে বড়বড় অট্টালিকা। মানুষ বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে বিভিন্ন সমস্যাও। অথচ হবিগঞ্জ পৌরসভার পরিকল্পিত কোন উন্নয়ন হচ্ছে না।’

এ ব্যাপারে মেয়র মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘উপ-নির্বাচনের পাস করার পর আমি মাত্র ১৮ মাস সময় পেয়েছি। কিন্তু এই সময়েও হবিগঞ্জ পৌরসভার ২১ কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন করেছি। শহরের জলাবদ্ধতা অনেকটা কমিয়ে এনেছি। যানজট নিরসনে রাস্তা প্রসস্থের কাজ ও ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করি এবার নির্বাচনে জয়ি হলে দ্রুত একটি আধুনিক পৌরসভা উপহার দিতে পারব।’