রায়হান আহমেদ

পূর্ব দিগন্তের সূর্যটা আগের চেয়ে বেশি তেজী হয়ে মধ্য আকাশ দখল করেছে। সূর্যের এই প্রখরতার কারণে ছাতা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া কষ্টকর। প্রকৃতিতে
বাতাস নেই। এ গরমের নিষ্ঠুরাতা অসহ্য। চারপাশে কেমন যেন একটা রুক্ষ রুক্ষ ভাব। বৃষ্টির দেখা পেতে আকাশের দিকে মাথা উচুঁ করে তাকিয়ে চাতক পাখি ডাকে, ‘জল দে, জল দে।’

এ উত্তাপের কারণে চারদিকে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। একের পর এক আউশ ধানের ক্ষেত। পানির অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। ধানের চারা সবুজ বর্ণ থেকে ঈষৎ হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। ফসল তেমন হবে না সহজেই বুঝা যায়। কৃষকের চিন্তার অন্ত নেই। লাভ তাে দূরের কথা, ফসলের ব্যয় উঠবে কিনা তাতেই সংশয়। দিনকে দিন সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। আগের মতাে ফসল হয় না, বৃষ্টি পড়ে না, গবাদিপশু দুধ দেয় না, রঙধনু দেখা যায় না, রাখাল বাঁশি বাজায় না। অচেনা এক জগতের সাথে বসবাস করতে হচ্ছে। পথের কিনারে তিন চারটি গরু। বাধ্য হয়ে মরা ঘাস চিবােচ্ছে। স্বাদ গ্রহণে নয়, পেট ভরাই তাদের মূল লক্ষ্য।

হঠাৎ হঠাৎ একটা মিষ্টি সুবাস গরম বাতাসের সঙ্গে মিশে চারদিক মাতিয়ে তুলছে। সুবাসটা অতি পরিচিত। ফুলের সুবাস। বকুল ফুলের । বসত বাড়িগুলাে থেকে কিছুটা দূরে পাশাপাশি দুটি প্রকাণ্ড বকুল ফুলের গাছ। গাছ দু’টি যে জায়গায়, সে জায়গাটা অতি নির্জন। ফুল কুড়ানাে ছাড়া অন্য সময় সেখানে কাউকে লক্ষ্য করা যায় না। এ সামান্য জায়গাটা বহু আগে থেকেই খালি পড়ে আছে। কেউ সেখানে চাষ-বাস বা অন্য কিছুই করে না । মালিক জায়গাটাকে কেন কাজে লাগাচ্ছেন না, তা কেউ জানে না। সম্ভবত তিনিও জানেন না। এখানে অন্য কেউ না আসলেও রহমত আলীকে প্রায়ই বকুল গাছের নিচে বসে থাকতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে পুরাে শরীর নরম দূর্বাঘাসে এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকেন। পুরােপুরি ঘুম আসে না তার। শুধু তন্দ্রার মতাে হয়।

অজ পাড়াগাঁ। গ্রামের রাস্তার অবস্থা সন্তোষজনক নয়। নামে মাত্র ইটের সলিং। পুরােটার বেহাল অবস্থা। এই ভাঙা রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে কলেজে আসা যাওয়া করতে হয়। এইচএসসি’র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমি। টেস্ট পরীক্ষার বেশি বাকি নেই। তাই কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নিয়মিত কলেজ যেতে হয়। অন্য দিনের তুলনায় আজ কষ্টের পরিমাণটা একটু বেশি হলাে। কলেজ থেকে ফেরার সময় রহমত আলী ভাইয়ের সাথে দেখা। বেচারা এই কড়া রােদের মধ্যে ঘেমে হেলেদুলে হাঁটছিল। মায়া হলো আমার।মায়া শব্দটি মানুষের ভেতরে বাস করছে সৃষ্টির শুরু থেকে। সুযোগ পেলেই ভেতর থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। আবার কারাে বেলায় সহজে আসে না। তারা কঠিন প্রাণ। আমি মায়ের মমতায় সিক্ত। তাই সহজেই কারও প্রতি মায়া জন্মে যায়। সাইকেলের পেছনের সিটে উঠিয়ে নিলাম তাঁকে। চালানােটাই কষ্টকর, সেখানে বাড়তি বােঝা নেয়ার কষ্ট বুঝতেই পারছেন।

রহমত আলীর আলাদা একটা পরিচয় আছে। তার বয়স চল্লিশের কম হবে না। আবার পঞ্চাশের বেশিও হবে না। অর্থাৎ চল্লিশ পঞ্চাশের মাঝামাঝি । বয়স হলেও বেশ সবল। মাতায় কাচা পাকা চুল। চোখ দুটি হলদেটে। ঠোটের উপরে দীর্ঘ গোফ। ভাঙা চোয়াল। কিন্তু পুরো চেহারা জুড়ে একটা মায়ার রেখা আঁকা। হাঁটার সময় সামান্য কুঁজো হয়ে হাঁটেন। দৃষ্টি থাকে ঠিক দু’পায়ের পাতায়।

তিনি ‘মুজিব পাগলা’ নামে সবার কাছে বেশি পরিচিত। বাংলার তাক অকপট নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সত্য নীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য সারাদিন ব্যায় করেন। তাঁর এ বিষয়টি সবাই পাগলামি বলে এড়িয়ে যায় । কিন্তু এতে তার কিছু যায় আসে না। এই রুটিন দায়িত্বের সাথে নিষ্পন্ন করেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য কীর্তি অত্যন্ত প্রশংসার । সে সময়ের তার লােমহর্ষক ৬ ঘটনা গােটা এলাকার জানা। তাঁর যুদ্ধে অংশ নেয়ার সূচনাটি অনেক সাহসিকতার পরিচয় বহন করে। সে ঘটনা দেহে শিহরণ জাগায়।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। পাকিস্তানি পশুরা বাঙালিদের নিষ্ঠুরভাবে প্রাণনাশ করছে। পাক বাহিনীর বড় বৈরী ছিল এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়। মুসলমানদের হত্যা করার পূর্বে অনেক সময় শেষ ইচ্ছে জিজ্ঞেস করা হতাে। মৃত্যুর আগে একটু সময় দেয়া হতাে। কিন্তু হিন্দু শুনা মাত্রই গুলি । কিছুই মানত না। হিন্দুদের বেলায় কোনাে দয়া দেখায়নি পাষণ্ডরা । কতিপয় মুসলমানকে সুযােগ দিয়েছিল, তাদের কু-কার্য সমাধার জন্য। এ দুনিয়ায় সবচেয়ে মূল্যবান প্রাণ। একে রক্ষা করার জন্য হানাদারদের গােলাম হওয়া তাদের কাছে দোষের মনে হলাে না।

(চলবে)

লেখক- রায়হান আহমেদ, সাংবাদিক।